সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতনকাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত কমিটি আরো দুই থেকে তিনটি বৈঠক শেষে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করবে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবার নতুন বেতনকাঠামো তৈরিতে অতীতের বিতর্ক ও বৈষম্য এড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য ২০১৫ সালের অষ্টম বেতনকাঠামোর বাস্তবায়ন-পরবর্তী অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে বুধবার (১৫ জুলাই) সচিবালয়ে পর্যালোচনা কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বেতন কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ, সম্ভাব্য বেতন কাঠামো, ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং আগের কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

পর্যালোচনা কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন মূলত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো যাচাই করা হচ্ছে, যাতে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের পর কোনো ধরনের বৈষম্য বা অসন্তোষ তৈরি না হয়। এজন্য আরো কয়েকটি বৈঠকের প্রয়োজন হবে।

সূত্রগুলো জানায়, কমিটির সদস্যরা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। তবে, এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না রেখে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সরকার চাইলে একসঙ্গেও মূল বেতন ও ভাতা কার্যকর করতে পারে।

এবারের বেতন কাঠামোয় মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বৃদ্ধির পরিবর্তে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন কমিটির অধিকাংশ সদস্য। একই সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতার কাঠামো নতুন করে নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

পর্যালোচনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, অষ্টম বেতনকাঠামো ঘোষণার পর কয়েকটি বিষয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা পরে আলাদা করে সমাধান করতে হয়েছিল। এবার সেই ধরনের জটিলতা যেন না থাকে, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করা হলেও ২০১৫ সালের পর আর কোনো নতুন পে-স্কেল হয়নি। ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে একই কাঠামোয় বেতন পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।

দীর্ঘ সময় নতুন কাঠামো না আসায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের বেতন গ্রেডের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছে গেছেন। ফলে তাদের নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন বেতনকাঠামোয় বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ধাপও বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি সুপারিশগুলো যাচাই-বাছাই করতে পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়।

পর্যালোচনা কমিটির এক সদস্য বলেন, অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছিল। এবার সরকার পরিবর্তনের কারণে কিছুটা সময় গেলেও এখন দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করতে বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা বিষয়ে একাধিক এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) জারি করতে হবে। সেগুলোর খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দ্রুত জারি করা হবে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক মো. নজরুল ইসলাম জানান, ‍সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় আছেন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার দ্রুত নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করবে বলে তারা আশা করছেন।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, পর্যালোচনা কমিটির কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই নবম জাতীয় বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।