আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সন্ত্রাসের অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ১৯৭৫ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ক্রসফায়ারের শিকার সিরাজ শিকদার থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ আমলের সব অপরাধ তদন্তের আওতায় আসছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে আওয়ামী লীগেরই প্রণীত আইনের বিধান অনুযায়ী দলটি নিষিদ্ধ হতে পারে এবং দলটির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।

ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রণয়ন করে। ২০১৩ সালে ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অরগানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করে আওয়ামী লীগই। এখন এই আইনেই রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের করা আইনেই ফেঁসে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

আইনজ্ঞরা বলেছেন, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি বাহিনী নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল। ১৯৪৫-৪৬ সালে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি নেতৃত্ব ও বাহিনীর বিচার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তারা বলেন, বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ হতে পারে দলটি। তবে কেউ কেউ বলেছেন, এই বিচারের পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে অথবা নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এই বিচারের আয়োজন।

রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান আছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান। তিনি বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। আবেদনটি তদন্ত সংস্থায় আসার পর সংস্থার একটি টিম তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দ্বারা যত অপরাধ কর্মকাণ্ড হয়েছে তার তদন্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। কবে নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিনের ঘটনা, একটু সময় লাগতে পারে।

৮ এপ্রিল সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করে জাতীয় সংসদ। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে কোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে জারি করা অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, যদি ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রতীয়মান হয় যে- কোনো সংগঠন এই আইনের ৩ ধারা উপধারা (২)-এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেছে, আদেশ দিয়েছে, চেষ্টা করেছে, সহায়তা করেছে, উসকানি দিয়েছে, মদদ দিয়েছে, ষড়যন্ত্র করেছে, সহযোগিতা করেছে অথবা অন্য যে কোনোভাবে সেই অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছে, তবে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা থাকবে সংগঠনটির কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করার, সংগঠনের নিষিদ্ধ ঘোষণা, এর নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত অথবা বাতিল করার এবং এর সম্পত্তি জব্দ করার।’ আইনে সংগঠন শব্দটির সংজ্ঞায়নও করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় সংগঠন বলতে যে কোনো রাজনৈতিক দলকেও বোঝাবে। পাশাপাশি দলের অধীন, সম্পর্কিত বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন অথবা গোষ্ঠীকে বোঝাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শনিবার এক অনুষ্ঠানে সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচারের কথা বলেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, অন্যরাও দাবি করেছেন। তদন্ত হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, খুব শিগগির রাজনৈতিক দল হিসাবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।

এরপর মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বিচার না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিচারে যদি দেখা যায়, তাদের নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না; তাহলে তারা কর্মকাণ্ড করতে পারবেন। বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দলটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ আছে। সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি হবে না, সে বিষয়ে সংস্থা তদন্ত করছে। তদন্ত করার পর যদি সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া যায়, প্রসিকিউশনের কাছে যদি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসাবে প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ আছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ প্রণয়ন করে। সেই আইনের আলোকে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ আইন সংশোধন করে সেখানে ‘অরগানাইজেশন’ শব্দটি যোগ করা হয়।

চিফ প্রসিকিউর বলেন, বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অরগানাইজেশনের (সংগঠন) বিচার এবং দল নিষিদ্ধ করার আইনগুলো আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় সরকারে এসে প্রণয়ন করেছে। অন্য কোনো সরকার কখনোই কিন্তু এই জাতীয় আইন প্রণয়ন করেনি। ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর আওতায় বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। অতীতে আওয়ামী লীগ আইনটি অব্যাহতভাবে ব্যবহার করেছে। একই আইনেই বর্তমানে ২০২৪ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ২০২৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। তিনি বলেন, দলকে তো আর সাজা দেওয়া যাবে না। কিন্তু দলকে কী ধরনের সাজা দেওয়া যাবে তা ট্রাইব্যুনালের সংশোধিত আইনে বলা আছে। যেমন, দলকে নিষিদ্ধ করা, নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত করা; অথবা সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশনা ইস্যু করা।

আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ যুগান্তরকে বলেন, শুনেছি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য তদন্ত শুরু হয়েছে। ১৯৭৪ থেকে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের বিচার তারা করবেন। এখন প্রশ্ন হলো-আওয়ামী লীগের কমিটিগুলো এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড রেজুলেশন করে করেছে কিনা, এটা তারা কিভাবে প্রমাণ করবেন। এই বিচারের পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে অথবা নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে বিচারের আওতায় আনা হতে পারে। এছাড়া, এই বিচার জামায়াতকে একাত্তর ইস্যুতে থ্রেট হিসাবে ব্যবহার করতে পারে সরকার। জামায়াতকে তারা বলতে চাচ্ছে, দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার হচ্ছে, তোমাদের বিচারও আমরা করব। তবে শেষ পর্যন্ত বিচারে নিষিদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ অন্য নামে আসতে পারে, এতে কোনো বাধা দেখছি না।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’র নামে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার এই হিসাব বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)। এছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজার মানুষকে আহত করার নির্দেশদাতা হিসাবে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।