দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির অনেক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। বহিষ্কৃত এই নেতাদের মধ্যে সাতজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বহিষ্কৃতদের বড় অংশই এখনো নিজেদের বিএনপির অংশই মনে করে এবং সে অনুযায়ী দলের পাশে থাকার চেষ্টা করে। বিএনপি সরকার গঠনের পর বহিষ্কৃত এসব নেতা দলে ফেরার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন আজকের পত্রিকাকে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি।
দলীয় সূত্র বলেছে, গত দেড় বছরে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৩০০০ নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। আর অন্তত ৯০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয় দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করায়। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার জন্য এই বহিষ্কৃতদের ফেরানো নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ভিন্নমত আছে বলে জানা গেছে। বহিষ্কার ছাড়াও আরও অন্তত ১,৫০০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা জোটের পক্ষ থেকে লোভনীয় পদ-পদবির প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও বিএনপির বহিষ্কৃতরা নিজেদের পুরোনো দলেই ফিরতে চান। অনেকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। কেউ কেউ আবার কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে জোর তদবির চালাচ্ছেন। এখনো কেন্দ্রের সবুজসংকেত না পেলেও, তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সব ধরনের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের দলে ফেরানোর বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
দলীয় সূত্রের মতে, বহিষ্কৃতদের কাউকে কাউকে দলে ফেরানোর বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ মহলের চিন্তাভাবনায় রয়েছে। তবে এই বিষয়টি এখন অতটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা আজকের পত্রিকাকে জানান, যাঁরা দলের জন্য নিবেদিত ছিলেন বা আছেন, কিন্তু কোনো কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তাঁদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কাজ চলছে। তবে এই মুহূর্তে এটি দলের কাছে বড় অগ্রাধিকার নয়। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করার ওপর। উপযুক্ত সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কেবল বহিষ্কৃতদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফেরানো নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কিছু ভিন্ন মত রয়েছে বলেও জানা গেছে। একাংশের মতে, দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বহাল রাখা উচিত। অন্য পক্ষের মতে, মাঠের জনপ্রিয় নেতাদের বাইরে রাখা কৌশলগত ভুল হতে পারে। কারণ, বহিষ্কারের আগে দীর্ঘ ১৭ বছর দলের স্থানীয় রাজনীতি এই নেতাদের ওপর ভর করেই চলেছে। নিরন্তর মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়ে আন্দোলন কমবেশি চাঙা রেখেছিলেন তারাই। তাই অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ‘সাধারণ ক্ষমার’ মাধ্যমে তাদের ঘরে ফেরানো উচিত।
বহিষ্কৃত বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা দলকে তাদের অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। বহিষ্কৃত হওয়ার পরও নিজেদের ‘খাঁটি বিএনপিকর্মী’ হিসেবে দাবি করেছেন তারা। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন।
এবারের সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। শেষ মুহূর্তে আসনটি মিত্র দলকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। দলে ফেরার চেষ্টার বিষয়ে জানতে চাইলে নীরব আজকের পত্রিকাকে বলেন, নির্বাচনে হারলেও মাঠ ছাড়েননি তিনি। প্রচুরসংখ্যক অনুসারী নিয়ে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছেন। নীরব বলেন, ‘জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বিএনপি করি এবং এটিই (বিএনপি) আমাদের শেষ ঠিকানা। এর বাইরে কিছু নাই। শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমি দল করি। দলের চেয়ারম্যান যেখানেই যান, তা-সহ বিএনপির সব কর্মসূচিতেই আমি অংশগ্রহণ করি।’
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নাটোর-১-এ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন বিএনপির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। দলে ফিরবেন কি না—জানতে চাইলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি তো দলের মধ্যেই আছি। দলের কাজ আগে যেমন করেছি, এখনো তেমনই করি। দল আবার পদায়ন করবে কি না বা সাংগঠনিকভাবে কাজে লাগাবে কি না—সেটা দলের ব্যাপার। দল কাজে লাগালে কাজ করব, না লাগালে করলাম না। তাতে দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানোর বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা আমরা আনন্দের সঙ্গে দিইনি। খুব কষ্ট নিয়ে দল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন এ ব্যাপারে দল পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখার বিষয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’








