দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে।
কিন্তু রেপো রেট কী? এটি বাড়ানো বা কমানোর ফলে ব্যাংক ঋণ, বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে?
রেপো রেট কী?
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে যে সুদহারে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়, সেটিই রেপো রেট বা নীতি সুদহার। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রানীতির হাতিয়ার।
রেপো রেট বাড়লে বাণিজ্যিক ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের খরচ বাড়ে। ফলে তারা গ্রাহকদের ঋণও বেশি সুদে দেয়। এতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে, বাজারে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়। বিপরীতে রেপো রেট কমলে ঋণ নেওয়া সহজ হয় এবং অর্থের প্রবাহ বাড়ে।
কেন বাড়ানো হয়?
বাজারে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে ভোগ ও বিনিয়োগ বাড়ে। এতে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণ নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমানোর চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে?
নীতি সুদহার বাড়লে:
ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যায়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কম ঋণ নেয়। বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ কমে। ভোগ ও বিনিয়োগের চাহিদা কমে আসে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ শুধু অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ নয়। সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, বিনিময় হার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ঋণ ও বিনিয়োগে কী প্রভাব পড়ে?
রেপো রেট বাড়লে ব্যাংক ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা যন্ত্রপাতি আমদানির মতো বিনিয়োগের খরচ বাড়ে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়েন, কারণ তারা তুলনামূলক বেশি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল।
এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলে।
করণীয় কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়। এর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। উৎপাদনমুখী খাতে স্বল্পসুদের ঋণ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিনিময় হার ও আমদানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে হবে। রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং খাতে সমন্বিত সংস্কার করতে হবে।
গবেষণা পতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এর রিসার্চ ফেলো ব্যাংকখাত গবেষক হেলাল আহমেদ জনি এর ভাষ্যমতে, কার্যকর মুদ্রানীতির পাশাপাশি শক্তিশালী আর্থিক খাত, সুশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে।
ইএআর/এমএএইচ/








