সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে একে একে মরদেহ হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই সাতজনের মৃত্যু হয়, পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো দুজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ জনে। নিহত সবাই ছিলেন ইউনিক পরিবহনের যাত্রী।
নিহতরা হলেন- কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা হাজি সাইফুল ইসলাম (৫০), তিনি মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে; সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমা থানার চণ্ডীপুর এলাকার তিন বছর বয়সী শিশু ফাইজা, বাবা জাহাঙ্গীর; সিলেটের সোবহানীঘাট থানা এলাকার সপ্তম রায় প্রীতম (২২), বাবা উত্তম রায়; কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চণ্ডিবের গ্রামের বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী (১৭), বাবা বাবুল মিয়া; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের আবুল হোসেন (৪৪), তিনি মৃত বারেক মিয়ার ছেলে; সিলেটের জৈন্তাপুর থানার উমনপুর গ্রামের আরমান (১৯), বাবা রফিকুল ইসলাম; কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), বাবা আব্দুস সালাম; ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার শেরপুর গ্রামের মো. সাইফুল ইসলাম ইমন, বাবা সিরাজুল ইসলাম; এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার ষাইধার (আটরামপুর) গ্রামের রুবেল সূত্রধর (৩৭), তিনি রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে।
এছাড়া দুই বাসের অন্তত ২৪ জন যাত্রী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঘটনার প্রকৃত কারণ। ফুটেজে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দ্রুতগতিতে উল্টোপথে চলে আসা বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস বিপরীত দিক থেকে আসা ইউনিক পরিবহনের বাসকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সড়কের পাশের খাদে ফেলে দেয়।
ইউনিক পরিবহনের বাসের পেছনে থাকা একটি গাড়ির ড্যাশক্যামে ধারণ করা ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউনিক পরিবহনের বাসটি কয়েক দফা রাস্তার ডানপাশে গিয়ে ওভারটেক করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফের বাম লেনে ফিরে আসে। ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসা বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটি ইউনিক পরিবহনের বাসের সামনের বাম পাশে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে যায়। এই আঘাতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে গিয়ে পড়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকে জানান, সামনে থাকা একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়েই বিপরীত লেনে চলে আসে বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি, আর তখনই তীব্র গতিতে সংঘর্ষ ঘটে ইউনিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে।
দুর্ঘটনায় আহত কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৫২) জানান, পাঁচ বন্ধু মিলে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে এসেছিলেন তারা। এর মধ্যে দুজন বিমানে ঢাকা ফিরে যান, বাকি তিনজন ফারুক মিয়াসহ ইউনিক পরিবহনের সকালের বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার সময় একটু ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে। বিভিন্ন মানুষজন ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। এর মধ্যে আমাদের বন্ধু সাইফুল ইসলাম নিহত হয়েছেন।”
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর জানান, দুর্ঘটনার পরপরই হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে মোট ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পরবর্তীতে ইএনটি, চক্ষু ও নিউরোসার্জারি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি তিনজনের মধ্যে একজনের সিটিস্ক্যান রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে, একজনের সিটিস্ক্যান এখনো সম্পন্ন হয়নি, এবং আরেকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
পরিচালক আরো জানান, হাসপাতালে আনা ১৬ জনের মধ্যে একটি শিশু প্রথমে মৃত ঘোষিত হয়, পরে আরেকজন রোগীর মৃত্যু হয়। বাকি ১৪ জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিদের অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই বলে জানান তিনি।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান বলেন, নিহত ৯ জনেরই পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হয়েছে। এখন চলছে মরদেহগুলো পরিবারের হস্তান্তর প্রক্রিয়া।
তিনি জানান, এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।







