এখন নারীদের মধ্যে একটি অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু প্রায়ই অবহেলিত হরমোনজনিত সমস্যা হলো পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভেরিয়ান সিনড্রোম (পিএমওএস)। আগে এটি পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) নামে পরিচিত ছিল। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এর নাম পরিবর্তন করে পিএমওএস (পিএমওএস) রাখা হয়েছে, যাতে রোগটির প্রকৃত হরমোনজনিত ও বিপাকীয় (মেটাবলিক) বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

কেন পিসিওএসের নাম পরিবর্তন করে পিএমওএস রাখা হলো?

দীর্ঘদিন ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম’ নামটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছিল। কারণ—
অনেক রোগীর ডিম্বাশয়ে তথাকথিত ‘সিস্ট’ থাকে না, তবু তাঁদের এই রোগ থাকতে পারে।
রোগটি শুধু ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়; বরং হরমোন, বিপাকক্রিয়া, ত্বক, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্যসহ শরীরের একাধিক সিস্টেমকে প্রভাবিত করে।
‘মেটাবলিক’ শব্দটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে।
‘পলিয়েন্ডোক্রাইন’ শব্দটি বোঝায় যে একাধিক হরমোনগত অস্বাভাবিকতা এতে জড়িত।

পিএমওএস
নাম পরিবর্তন করে পিএমওএস করা হলেও রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার মূল নীতিমালা অপরিবর্তিত আছে

পিএমওএসে হরমোনের অসামঞ্জস্য কেন হয়?
১. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
অনেক পিএমওএস রোগীর শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে শরীর বেশি ইনসুলিন তৈরি করে এবং অতিরিক্ত ইনসুলিন ডিম্বাশয়কে বেশি পরিমাণে অ্যান্ড্রোজেন (পুরুষ হরমোন) উৎপাদনে উদ্দীপিত করে।
২. অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেন
অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বেড়ে গেলে ডিম্ব স্ফুটন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অনিয়মিত মাসিক, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম ও বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি দেখা দেয়।
৩. জেনেটিক বা বংশগত কারণ
পরিবারে মা বা বোনের পিএমওএস থাকলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
৪. স্থূলতা ও জীবনযাত্রা
অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে এই রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

পাল্টে গেল পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা পিসিওএস রোগের নাম, কেন নতুন নাম এল

প্রতিরোধে করণীয়

১. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
শরীরের ওজন মাত্র ৫-১০ শতাংশ কমালেও হরমোনের ভারসাম্য উন্নত হতে পারে, পাশাপাশি মাসিকও হতে পারে নিয়মিত।
২. নিয়মিত ব্যায়াম
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।

হাঁটা ব্যায়াম
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়

৩. সুষম খাদ্যাভ্যাস
কম চিনি, কম পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং বেশি আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত।
৪. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
অনিয়মিত মাসিক, ওজন বৃদ্ধি, ব্রণ বা অতিরিক্ত লোম দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ব্যায়াম না করেও যেভাবে ব্যায়ামের উপকার পাবেন

চিকিৎসা না করলে পিএমওএসের জটিলতা

১. বন্ধ্যত্ব

নিয়মিত ডিম্ব স্ফুটন না হওয়ায় গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে।

২. টাইপ-২ ডায়াবেটিস

দীর্ঘমেয়াদি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

৩. হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি

উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

৪. এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার

দীর্ঘদিন অনিয়মিত মাসিক থাকলে জরায়ুর আবরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়ে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

৫. মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা

ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

পিএমওএস
পিএমওএসের চিকিৎসা না করলে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে

উপসংহার

পিএমওএস একটি দীর্ঘমেয়াদি হরমোন ও বিপাকজনিত রোগ। এটি শুধু ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়; বরং পুরো শরীরের হরমোন ও মেটাবলিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মাসিক অনিয়ম, অতিরিক্ত লোম, ব্রণ বা ওজন বৃদ্ধি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে পিএমওএস সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং ভবিষ্যতের গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়।

লেখক: কনসালট্যান্ট এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, এপিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চট্টগ্রাম

মাত্র ১৫ মিনিট ব্যয় করেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন মানসিক চাপ