টানা ছয় দিনের অতি ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। ঘরবাড়ি. দোকানপাট, সড়ক-মহাসড়ক পানির নিচে। থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া, শৌচকার্যসহ দৈনন্দিক কার্যক্রম সারতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।
প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে শত শত গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। দুর্গত এলাকায় তীব্র খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। শুক্রবার পাহাড়ধসে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর জীবিকা হারিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন নিু আয়ের মানুষ।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে রেকর্ড পরিমাণ ৩২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত এ বৃষ্টিপাত পরিমাপ করা হয়। এ সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে প্রায় এক হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্ব, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী-বর্তমানে কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী-এ পাঁচ নদ-নদীর পানি ৯টি স্টেশনে বিপৎসীমার উপরে রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলিতে, মনু নদের পানি মনু রেলসেতু ও মৌলভীবাজারে, খোয়াই নদের পানিহবিগঞ্জের বল্লায়, সাঙ্গু নদের পানি বান্দরবান ও দোহাজারীতে এবং মাতামুহুরী নদীর পানি লামা ও চিরিঙ্গা স্টেশনে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে কুশিয়ারাসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং সুরমার তীরবর্তী এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বাড়ির উঠোনে হাঁটু পানিতে খেলতে নেমে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে গিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সাতকানিয়ার বাজালিয়ায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে কবরস্থান থেকে কয়েকটি লাশ ভেসে গেছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় নৌকা ডুবে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। আরেক বোন সাওরিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে। এছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সোমেশ্বরী, যাদুকাটা এবং ভোগাই-কংস নদ-নদীর পানিও বাড়তে পারে। এসব নদ-নদীর কোনো কোনো স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীতে বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। জেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।
শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে বাড়ির উঠানে হাঁটুপানিতে খেলার সময় শিশু মিরাজ ও আশিক ঢলের পানিতে ভেসে যায়। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে উদ্ধার করে তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। ১১ বছর বয়সি আশিক বাহারচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে। অপর শিশু মিরাজ (১০) একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা। একই উপজেলার সরল ইউনিয়নের পশ্চিম জালিয়াঘাটা এলাকায় ঢলের পানিতে পড়ে তাহিনা নুর (১২) নামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢলের পানিতে পড়ে ভেসে যায় শিশু তাহিনা। তাহিনা ওই এলাকার আবদুল করিমের মেয়ে।
সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আদালত ভবন, সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পৌরসভা ও থানা ভবন থানা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের একটি কবরস্থানের কবর থেকে পানির ঢলে ভেসে গেছে বেশ কয়েকটি লাশ। পরে এগুলো উঁচু স্থানে কবর দেওয়া হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ডুবে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে উপজেলার বিভিন্ন অংশে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। চন্দনাইশ এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। মহাসড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার কসাইপাড়া ও পাঠানিপুল ব্রিজ এলাকায় দেখা গেছে রীতিমতো মহাসড়কের ওপরই জাল ফেলে মাছ ধরার উৎসবে মেতেছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, শুক্রবার বৃষ্টি না হওয়ায় নগরীর বেশির ভাগ এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। তবে চান্দগাঁওসহ কিছু নিচু এলাকায় পানি রয়ে গেছে। দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার ও সিটি করপোরেশন।
চকরিয়া (কক্সবাজার) : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় বন্যার পানিতে নৌকা ডুবে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) ও জেরিন (৭) নামে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। আরেক বোন সাওরিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বাড়িতে পানি ওঠায় শুক্রবার সকালে নৌকাযোগে পাশের উঁচু এলাকায় যাওয়ার সময় প্রবল স্রোতে শিশুদের বহনকারী নৌকা ডুবে যায়। এতে ঝর্ণাসহ তার দুই বোন সাওরিন মনি ও জেরিন পানিতে তলিয়ে যায়। বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, নৌকাডুবির পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঝর্ণার লাশ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেরিন মারা গেছে বলে তার বাবা আবদুল মালেক জানান।
কক্সবাজার : টানা ছয় দিনের অতি ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কার্যত পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ। প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ভেঙে গেছে বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ। এতে তলিয়ে গেছে শত শত গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন। গত কয়েক দিনের দুর্যোগে ১৩ রোহিঙ্গাসহ ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছে এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
আগে বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে বিল-ঝিল পেরিয়ে নদীতে যেত। কিন্তু রেললাইন নির্মাণের পর সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির চাইল্যাতলীর বাসিন্দা ফারুক আহমদ বলেন, রেলপথ নির্মাণের সময় প্রয়োজনের তুলনায় খুব কমসংখ্যক কালভার্ট করা হয়েছে। যেগুলো হয়েছে, তার অনেকগুলো আবার সঠিক স্থানে নয়। ফলে নিচু এলাকার পানি আটকে যাচ্ছে। সেই পানি এখন সড়ক ডুবিয়ে বসতবাড়িতে ঢুকছে।
ঈদগাঁওয়ের নাসির উদ্দিন জানান, চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত রেললাইন অনেক জায়গায় কার্যত বাঁধের মতো কাজ করছে। পানি চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় আরও বেশি কালভার্ট প্রয়োজন ছিল। জমে থাকা পানি এখন কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও প্লাবিত করছে।
চকরিয়া শান্তিবাজার এলাকার আবদুল হক বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে এলাকাটি পানিবন্দি-প্রশাসন কিংবা অন্য কারও সহযোগিতা আসেনি। রান্না বন্ধ থাকায় পরিবারের নারী-শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছি। মাতামুহুরী কোনাখালীর বাসিন্দা হারুন রশিদ বলেন, এ বছর বৃষ্টিতে বিলে যেমন পানি বেড়েছে, মাতামুহুরী নদীতেও তেমন পানি বেশি। প্রভাবশালীরা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে স্লুইসগেট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে হাজারো যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সময়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলার সামগ্রিক দুর্যোগ পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও উদ্বেগজনক।
রাঙামাটি : টানা ভারি বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির দীঘিনালা-সাজেক সড়কের মাচালং ও বাঘাইহাটবাজার এলাকায় রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ৫৬১ পর্যটক আটকা পড়েন। সাজেকে আটকাপড়া পর্যটক সবাইকে সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্যোগে পানিতে ডুবে থাকা সড়কগুলোতে নৌকা ও বাঁশের ভেলার মাধ্যমে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়। বৃহস্পতিবার ১৫০ জন পর্যটক সাজেক ছাড়েন। শুক্রবার সকালে ছেড়েছেন বাকি ৪১১ জন।
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি : বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এখনো যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। মহালছড়ি উপজেলায় একটি সেতু তলিয়ে যাওয়ায় মুবাছড়ি এলাকার সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দীঘিনালা উপজেলার মাইনী নদীর পানিও কমছে। তবে নিম্নাঞ্চল হওয়ায় মেরুং ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত রয়েছে।
এদিকে বন্যার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। মহালছড়ি-গুইমারা সড়কের সিন্দুকছড়ি এবং খাগড়াছড়ি শহরের শালবন, কুমিল্লাটিলা ও হরিনাথপাড়া গ্যাপ এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও অধিকাংশ লোকজন বাড়ি ছেড়ে যায়নি।
বান্দরবান : বৃষ্টি কমায় বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে ধীরগতিতে। শুক্রবারও বান্দরবান জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ দ্বিতীয় দিনের মতো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বান্দরবান-কেরানীহাট, চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের তিনটি স্থানে এবং বান্দরবান-বাঙালহালিয়া রাঙামাটি সড়কের কয়েকটি স্থানে সড়কে বন্যার পানি ওঠায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সাতটি উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধসে ও সড়কের ওপর মাটি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে জানিয়েছেন পরিবহণ শ্রমিকরা।
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) : আট দিনের বৃষ্টিতে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। বাড়িঘরের আঙিনা ও আশপাশে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে গিয়ে মাছ ভেসে যাওয়ায় খামারি ও গৃহস্থরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জলাবদ্ধতার কারণে আমন মৌসুমের চাষাবাদও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজার : অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। জেলার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায় ১৭টি ইউনিয়নের মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর ভাঙনে তিনটি ইউনিয়নের ৭-৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর বাঁধ ভাঙনে টেংরা, কামারচাক, মনসুরনগর ও পাঁচগাঁও, কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডি, সদর, হাজিপুর ও শরীফপুর এবং সদর উপজেলার মনুমুখ, কামালপুর, আখাইলকুড়া, চাঁদনীঘাট, কনকপুর ও পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে।
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) : কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর সীমান্তের ওপার থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উজিরপুর ও ভাংগারহাট এবং কুলাউড়া উপজেলার ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও আকুয়া মনু বাঁধের ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এদিকে বন্যার পানিতে টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের আসরাফ আলী আসইয়ের (৭২) মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার সকালে লাশ পানিতে ভাসতে দেখে স্থানীয়রা উদ্ধার করেন।
হবিগঞ্জ : টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়ছে। এতে খোয়াই নদীর বাঁধ দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করায় ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় লোকজন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। শুক্রবার বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ জি কে গউছ এমপিসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা। বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন জি কে গউছ। দুর্গত মানুষজনের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।








