• চার লেনের সড়ক, কিন্তু বর্ষায় চার কিলোমিটারই যেন খাল
  • ড্রেনেজ সংকটে দুর্ভোগে ২০ লাখ মানুষ
  • ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পার্বত্য জেলার যোগাযোগ

চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়ক; এটি উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের কাছে শুধু একটি সড়ক নয়, বরং জীবন ও জীবিকার প্রধান সংযোগপথ। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়েই হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, ভূজপুর, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির লাখো মানুষ চট্টগ্রাম নগরে আসা-যাওয়া করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই মহাসড়ক।

কিন্তু বর্ষা এলেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অক্সিজেন মোড় থেকে বড়দিঘির পাড় হয়ে চৌধুরীহাট পর্যন্ত অংশ চার থেকে পাঁচ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট, সেখানে বর্ষার দিনে একই পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। অনেক সময় যানবাহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষকে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়।

 

আরও পড়ুন

‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’

প্রায় এক দশক আগে চার লেনে উন্নীত করা এই মহাসড়কে কেন এখনো প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, সেই প্রশ্ন স্থানীয়দের।

চার লেন হয়েছে, কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা হয়নি

২০১৫ সালে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় যানবাহনের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর ওপর। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। ফলে সড়ক প্রশস্ত হলেও বর্ষায় পানি দ্রুত সরানোর মতো কার্যকর অবকাঠামো তৈরি হয়নি।

jagonews24এটি উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের কাছে শুধু একটি সড়ক নয়, বরং জীবন ও জীবিকার প্রধান সংযোগপথ/ছবি: জাগো নিউজ

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে যে কয়েকটি কালভার্ট রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই সরু এবং পাহাড়ি ঢলের বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ করার সক্ষমতা নেই। অনেক স্থানে পানি চলাচলের প্রাকৃতিক খাল দখল, ভরাট কিংবা সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি সড়কের দুই পাশে জমে শেষ পর্যন্ত মহাসড়কের ওপর উঠে আসে।

ভৌগোলিক অবস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ

এই এলাকার ভৌগোলিক গঠন জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের পশ্চিম পাশে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। বর্ষাকালে এসব পাহাড় থেকে প্রচণ্ড বেগে নেমে আসে ঢলের পানি। মাঝখানে রয়েছে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেললাইন এবং বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ও বিল। পূর্বপাশে অবস্থান করছে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়ক। স্বাভাবিকভাবে এই বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো দিয়ে নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় ঢলের পানি আটকে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই পানি মহাসড়কের ওপর উঠে আসে এবং পুরো এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখ মানুষ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না, পুরো এলাকার জলপ্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ড্রেনেজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে ভবিষ্যতেও একই পরিস্থিতি চলতে থাকবে।

চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ্উদ্দীন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই সড়কে জলাবদ্ধতার বিষয়টি বিগত কয়েক বছরের। এবার মূলত ভারী বর্ষণের ফলে ভাটিয়ারী অঞ্চলের পানির ঢলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার একপাশে রেললাইন ও অন্য পাশে আবাসিক ভবন। পানি যাওয়ার জন্য কোনো কালভার্ট ও ড্রেনেজ সিস্টেম নেই। ফলে এই দুরবস্থার সৃষ্টি।’

তিনি বলেন, ‘সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু সড়ক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও সমন্বিতভাবে উন্নত করতে হবে। কোথায় কী পরিমাণ পানি জমছে, বিদ্যমান কালভার্টের সক্ষমতা কতটুকু এবং কোথায় অতিরিক্ত কালভার্ট বা ড্রেনেজ প্রয়োজন এসব বিষয় কারিগরি সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

স্থবির হয়ে পড়ে ২০ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা

এই মহাসড়ক অচল হয়ে গেলে শুধু হাটহাজারীর মানুষের সমস্যা হয় না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সঙ্গে চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ এটি। পাশাপাশি রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও ভূজপুর এলাকার মানুষও এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে, প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কয়েক ঘণ্টার জলাবদ্ধতাই পুরো অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল করে দেয়।

আরও পড়ুন

চারদিকে বন্যার পানি, ভেলায় ভাসিয়ে শেষ বিদায়!

বালুছড়ার স্থানীয় বাসিন্দা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আহমদ শাহনুর ইমরান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড়দিঘির পাড়ের জলাবদ্ধতায় আমরা কয়েক বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। বর্ষাকালে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই সময়মতো ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে পরীক্ষা, ক্লাস ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজেও বিঘ্ন ঘটে।’

jagonews24এই মহাসড়কে অনেক সময় যানবাহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে এবং কোমরসমান পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়/ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, ফলে আলাদা ভ্যান নিয়ে পথ পার হতে হয়। এতে ১০০ গজ জায়গার জন্য ৩০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। যারা এই পথে নিয়মিত যাতায়াত করে তাদের সময় ও আর্থিক অপচয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে দুর্ভোগও পোহাতে হচ্ছে।’ এ সমস্যা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর একমাত্র প্রধান সড়ক যোগাযোগও এটি।

প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক বাস এই সড়ক ব্যবহার করে। বর্ষার দিনে বাসগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতায় আটকে থাকে। ফলে ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

আরও পড়ুন

২৪ ঘণ্টা পরও পানির নিচে ‘অভিশপ্ত’ নিউমার্কেটের সড়ক

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কখনো কখনো সকালবেলার ক্লাসে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যায়। অনেকেই মাঝপথে বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই এই মহাসড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনকে শুধু যোগাযোগ সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জনজীবনের স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন করা জরুরি।- অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমীন, উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের জলাবদ্ধতা শুধু একটি সড়কের সমস্যা নয়, এটি শিক্ষা কার্যক্রমের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এটা শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব ফেলছে না, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি জেলা, উত্তর চট্টগ্রাম জেলাসহ হাটহাজারীর আপামর জনতার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ভারী বৃষ্টি হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া ব্যাহত হয়। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকে। ফলে ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই এই মহাসড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনকে শুধু যোগাযোগ সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জনজীবনের স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন করা জরুরি।

আরও পড়ুন

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় ঢাকায় দিনে ক্ষতি শত কোটি টাকা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার মাসুদ ফরহান অভি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেন না। দীর্ঘ যানজটের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও একাডেমিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে। অনেক সময় অফিসে উপস্থিত হতে কয়েক ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় লেগে যায়। সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।’

ব্যাহত হয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা

জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন রোগীরা। হাটহাজারী, রাউজান কিংবা পার্বত্য জেলা থেকে গুরুতর রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে আনার প্রধান পথ এটি। কিন্তু সড়ক ডুবে গেলে অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকে।

জলাবদ্ধতার কারণে শুধু সাধারণ মানুষের চলাচলই নয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন রোগীরা। অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। হাটহাজারী, রাউজান কিংবা পার্বত্য জেলা থেকে গুরুতর রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে আনার প্রধান পথ এটি। কিন্তু সড়ক ডুবে গেলে অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

‘বন্যায় বাপ-দাদার শেষ স্মৃতিটুকু নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো’

চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা দুর্ঘটনার রোগীদের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। ফলে এই জলাবদ্ধতা শুধু দুর্ভোগ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি।

অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব

চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বাণিজ্যিক নগরী। উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য, সবজি, ফল, মাছ, বাঁশ, কাঠ এবং অন্যান্য পণ্য এই সড়ক দিয়ে নগরে আসে। অন্যদিকে নগর থেকে শিল্পকারখানার কাঁচামাল, নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এসব এলাকায় যায়।

jagonews24প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল/ছবি: জাগো নিউজ

জলাবদ্ধতার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক আটকে থাকায় পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়ে। দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন কৃষিপণ্যও ক্ষতির মুখে পড়ে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্ষাকালে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময় নষ্ট হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে বাজারদরেও।

প্রতি বছর একই চিত্র, নেই সমাধান

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এলাকা পরিদর্শন করে। সমস্যা চিহ্নিত করা হয়, নানা আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু বর্ষা শেষ হলে বিষয়টি আর অগ্রাধিকার পায় না। পরের বর্ষায় আবারও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

আরও পড়ুন

খাল-নদীর পথ হারিয়েছে বৃষ্টির পানি, বারবার ডুবছে ঢাকা

বড়দিঘির পাড়ের বাসিন্দা মো. মোমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বড় আকারের বক্স কালভার্ট নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাধার সংরক্ষণ এবং সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি।’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। তাই অতীতের বৃষ্টিপাতের তথ্য ধরে তৈরি অবকাঠামো এখন আর যথেষ্ট নয়। নতুন বাস্তবতায় পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন হলো চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার মূল কারণ। আর চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের জলাবদ্ধতা কেবল অতিবৃষ্টির কারণে হচ্ছে না, এর সঙ্গে এলাকার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, সংকুচিত খাল এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলোও জড়িত।- অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান, নগর পরিকল্পনাবিদ

তাদের মতে, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়ককে শুধু একটি সড়ক প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত ড্রেনেজ ও বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক অচল হয়ে পড়বে এবং এর মূল্য দিতে হবে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষকে।

নগর পরিকল্পনাবিদ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণ হলো চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার মূল কারণ। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের জলাবদ্ধতা কেবল অতিবৃষ্টির কারণে হচ্ছে না, এর সঙ্গে এলাকার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, সংকুচিত খাল এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলোও জড়িত।’

আরও পড়ুন

১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

তিনি বলেন, ‘সড়ক নির্মাণ বা প্রশস্তকরণের সময় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সমান গুরুত্ব না দিলে এমন সমস্যা বারবার ফিরে আসবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো জলাধার ও ক্যাচমেন্ট এলাকা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ড্রেনেজ পরিকল্পনা প্রণয়ন, পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার বক্স কালভার্ট নির্মাণ, প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধার এবং পানিপ্রবাহের পথ সংরক্ষণ জরুরি। শুধু সড়ক উঁচু বা প্রশস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, বর্ষার প্রতিটি মৌসুম যেন একই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে- সড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী সমাধান কবে হবে? যতদিন সেই প্রশ্নের কার্যকর উত্তর মিলবে না, ততদিন চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের কয়েক কিলোমিটার অংশ বর্ষায় সড়ক নয়, বরং একটি অস্থায়ী জলাধার হিসেবেই থেকে যাবে।

এমআরএএইচ/ইএ/ এমএফএ