পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রস্তাবিত বাজেট থেকে কমালে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দিতে হবে এবং লাল-সবুজের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ১৬ নম্বর মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। যদিও রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা বাজেটের ছাঁটাই প্রস্তাবে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ হ্রাস করার প্রস্তাব করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ছাঁটাই প্রস্তাব অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত ১৬ নম্বর দাবি হ্রাস করে এক টাকায় নামিয়ে আনা হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসগুলো বন্ধ করে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক লাল-সবুজের পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে।’ এতে প্রবাসীদের সেবা বন্ধ হয়ে যাবে এবং জাতিসংঘে চাঁদা দেওয়া সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খলিলুর রহমান বলেন, চাঁদা দিতে না পারলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মঞ্জুরির প্রস্তাব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা বৈঠকে জানানো হয়, এই দাবির ওপর ২৬ জন সংসদ সদস্য ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলাম, রংপুর-১ আসনের মো. রায়হান সিরাজী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মো. মাসুদ পারভেজ বক্তব্য দেন।

জিএম নজরুল ইসলাম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং বিদেশে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে এ মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা থাকা দরকার। এ সময় তিনি বাংলাদেশে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য নিয়ে কথা বলেন। যদিও তাঁর জন্য বরাদ্দকৃত সময় শেষ হওয়ায় বক্তব্য শেষ করতে পারেনি।

মো. রায়হান সিরাজী ছাঁটাই প্রস্তাবের প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। আগামী একনেক বৈঠকে এ প্রকল্প তুলে ধরে বরাদ্দ অনুমোদন করা হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ খুশি হবে।

জহিরুল ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স যোদ্ধা মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তাঁরা নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন। আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মী পরিবর্তন, কফিল পরিবর্তন, ভিসা ও জরিমানার সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এসব বিষয়ে আরও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

মাসুদ পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়া, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিদেশে শ্রমিকদের বিপদ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।

ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিবর্তনশীল ও জটিল বিশ্ব ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অনেকাংশে দূরদর্শী ও সক্রিয় কূটনীতির ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কূটনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফার্স্ট।’ প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে এই নীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনগণের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা কোনো সাধারণ ব্যয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত করার কৌশলগত বিনিয়োগ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বাজেট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তাঁর হিসাবে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ।

তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট ছিল ১ হাজার ৭৬৪ কোটি ৩৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এর মধ্যে পরিচালন বাজেট ছিল ১ হাজার ৫৪২ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ছিল ২২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালন বাজেট ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ২৩৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। গত বছরের তুলনায় এ বরাদ্দ ৪ দশমিক ৫৩৬ শতাংশ বেশি বলে জানান তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেটের বড় অংশ বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর কার্যক্রম চালাতে ব্যয় হয়। টাকার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ওঠানামার কারণে প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির হার আরও কম হতে পারে।

তিনি জানান, মালয়েশিয়ার জোহর বাহরু, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে নতুন মিশন খোলা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এই চারটি মিশনের কার্যক্রম শুরু করতে ৩০ কোটি ৩৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে গাম্বিয়ার করা মামলা পরিচালনার জন্য ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের চারটি ইউনিট ও বিদ্যমান ৮৩টি মিশনের পরিচালন ব্যয় মেটাতে ২১ কোটি ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

উন্নয়ন বাজেটে পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ২৩৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বার্লিন, জেদ্দা, ক্যানবেরা ও কায়রোতে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স বা ভবন নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে।