‎শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ও উত্তরায় সড়ক অবরোধ করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।

‎পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বুধবার ১৫ জুলাই পরীক্ষা শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ শুরুর আগে তারা সড়কে অবস্থান নেন। এতে সায়েন্স ল্যাব মোড় দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর আড়াইটার দিকে সরেজমিনে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা এসে সড়কে অবস্থান নিচ্ছেন। একপর্যায়ে তারা সড়কের বিভিন্ন অংশে বসে পড়েন এবং যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। একই সময় মোড়ের চারপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।

‎অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীদের ‘দফা এক, দাবি এক—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’, ‘তুমি কে, আমি কে—ফার্মের মুরগি’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে—শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। তাদের হাতে পরীক্ষা স্থগিত, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং তিন দফা দাবিসংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডও ছিল।

আন্দোলনরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরীক্ষার্থী বলেন, আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলাম, আজ বুধবার পরীক্ষা শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে লংমার্চ করব। আমাদের দাবি এখনো মানা হয়নি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবারও একই দাবিতে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, নীলক্ষেত, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীরা। পরে তারা ঘোষণা দেন, বুধবার পরীক্ষা শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করবেন।

‎এদিকে আজ দুপুর দেড়টার দিকে পরীক্ষা শেষে তারা উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আটকে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। ‎তারা মহাসড়কের চারটি লেনই আটকে দিয়েছেন। এতে এ সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সড়কে রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, নবাব হাবিবুল্লাহ কলেজ ও উত্তরা হাইস্কুলসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদের দেখা গেছে।

নবাব হাবিবুল্লাহ কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা আমাদের অধিকারের জন্য দাঁড়িয়েছি। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাই। আমরা লংমার্চ করব।

‎এসময় শিক্ষার্থীদের’ তুমি কে আমি কে, ব্রয়লার, ব্রয়লার, কে বলেছে কে বলেছে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী’; ’ দফা এক দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’-সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে।

‎জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, ওই এলাকার রাস্তা বন্ধ হয়েছে ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে। উত্তরা বিএনএস টাওয়ারের সামনে দুইদিকে যান চলাচল বন্ধ আছে।

শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—দুর্যোগ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৩ জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ।

এর আগে ‎বুধবার (১৪ জুলাই) ‎এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে দিনভর নানা মঙ্গলবার নাটকীয়তা, বিভিন্ন স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি, এমনকি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠলেও কোনো সমাধান আসেনি।

আন্দোলনকারীদের দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরকার জানিয়ে দিয়েছে, বন্যাকবলিত চট্টগ্রাম বিভাগ বাদে অন্যান্য জেলায় পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বুধবারের পরীক্ষা স্থগিত না হলে তারা সচিবালয় অভিমুখে ‘লং মার্চ’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

‎‎ফলে বুধবার চট্টগ্রাম ছাড়া নয়টি সাধারণ বোর্ডের অধীনে এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা হয়।

এদিন চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা ছাড়া অন্যান্য জেলায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিমে আরবি দ্বিতীয় পত্র এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি বিএমটির ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ১ ও ২, ভোকেশনালের উচ্চতর গণিত ১ ও ২ এবং ডিপ্লোমা ইন কমার্সের উচ্চতর হিসাব বিজ্ঞান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

‎‎বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে গত ৮ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম বিভাগ ও এ বোর্ডের জেলাগুলোতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত আছে, যা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

‎রোববার দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে সোমবারের এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র পরীক্ষা স্থগিতের দাবি ওঠে।

‎তবে চট্টগ্রাম বোর্ডে ও এ বিভাগ ছাড়া সোমবার অন্যান্য এলাকায় পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় শিক্ষা বোর্ডগুলো। ভারী বর্ষণ চলে সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত। বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ আসে। একই দিন পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষা দুইটি ভুল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় পরীক্ষার্থীদের।

এরমধ্যেই সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ঘিরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়ে। যেখানে শিক্ষামন্ত্রীকে এক নারীর সঙ্গে আলাপচারিতায় পরীক্ষার্থীদের’ ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করতে শোনা যায়।

‎এমন বাস্তবতায় শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ, পরীক্ষা স্থগিত করা এবং সোমবারের পরীক্ষায় বসতে না পারা পরীক্ষার্থীদের ফের সুযোগ দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, জয়পুরহাট, বরিশাল, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

একইদিন বিকেলে জাতীয় সংসদে পরীক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগির সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া ওই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

‎পরীক্ষা দিতে সমস্যায় পড়া শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।