ভারতের চতুর্থ রাজ্য হিসেবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড কার্যকর করার লক্ষ্যে সোমবার (২৯ জুন) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ করার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিছু হঠেছে সরকারপক্ষ। বিলটি নিয়ে আরো বিশদে আলোচনার জন্য সময় নেওয়া হয়েছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আইন ভারতের সব সম্প্রদায়ের জন্য এক ও অভিন্ন আইনের কথা বলে। এই আইন কার্যকর হলে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, লিভ-ইন রিলেশন ও দত্তক সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য একই হবে বা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এই আইনে ছেলে ও মেয়েদের বিয়ের বয়স একই হবে। ধর্মীয় আইনের অবসান ঘটিয়ে তিন তালাক, বহুবিবাহ ও হালালা বিয়ে একেবারে নিষিদ্ধ হবে।

সংবেদনশীল এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কেন্দ্রীয় আইন মেনেই পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত বিলেও পাহাড় ও জঙ্গলমহলের কিছু বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি-নীতি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মানুষের কাছে যেন ভুল বার্তা না যায়, সে বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে চাইছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আরো বিশদে আলোচনার প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। আর সেই কারণে সবদিক খুঁটিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি তৈরি হচ্ছে বলে খবর।

সূত্রের খবর, শুভেন্দু অধিকারীর সরকার চাচ্ছে সেই কমিটির শীর্ষে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি রঞ্জনপ্রসাদ দেশাইকে রাখতে। প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি জারি করার সময়েও সাবেক বিচারপতি রঞ্জনপ্রসাদ দেশাইকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল খুঁটিনাটি পর্যালোচনার জন্য। এই কমিটি সমাজের সম্প্রদায়ের মানুষের মতামত গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে বিলটির চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করলে তারপরেই এই বিল পেশ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংক্রান্ত বিল পেশ না হলেও সোমবার রাজ্য বিধানসভায় পেশ হয়েছে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। মূলত সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, দাঙ্গা এবং পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলা রুখতে এই বিলগুলো আনা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে-

* পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা (সংশোধনী) আইন, ২০২৬: এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাজ্যে একটি ‘ক্লেম কমিশন’ গঠন করা হবে। সম্পত্তি দখল বা ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ শুনে এই কমিশন ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করবে এবং সেই টাকা অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ও সম্পত্তি বিক্রি করে আদায় করা হবে। গুজরাট, উত্তর প্রদেশের পর তৃতীয় রাজ্য হিসেবে এই আইন পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করা হবে।

* পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬: সাম্প্রতিক সময়ে ফলতা থানা ভাঙচুর ও পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার মতো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন আইন আনা হচ্ছে। এর অধীনে সংগঠিত অপরাধের মূলচক্রী, অর্থদাতা, বেআইনি অস্ত্র ও মাদক কারবারী এবং মানব পাচারকারীদের সরাসরি ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এই সব অপরাধকে ‘জামিনঅযোগ্য’  ধারার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং দুষ্কৃতীদের দমন করতে তার সরকার কঠোরতম আইনি কাঠামো তৈরি করছে। সোমবার এই বিলগুলো পাস হলে রাজ্যের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসতে চলেছে।

এছাড়াও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিল হিসেবে, বিগত বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের আমলের ‘ভুল শোধরাতে’ জোড়া ওবিসি আইন সংশোধনী বিল পেশ হয়েছে বিধানসভায়। বিল দুটির নাম- ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান এসসি  অ্যান্ড এসটি) রিজার্ভেশন অব ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। পেশ করেন অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ মন্ত্রী গৌরীশংকর ঘোষ।

১৮৬টি ভোটে এই বিল পাস হয়েছে বিধানসভায়। কালীঘাট ও বিদ্রোহী তৃণমূল মিলিয়ে মোট ১৭ জন এর বিরোধিতা করে ভোটদান করেন, ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন ৬ জন। বিগত সরকার ওবিসি সংরক্ষণের জন্য ৬৬ থেকে বাড়িয়ে ১১৩টি জাতিকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সেই অতিরিক্ত তালিকাভুক্ত জাতিদের বাদ দেওয়া হলো। এই সংশোধনীর বিরোধিতা করেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি, ডোমকলের সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমানরা।