গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ময়লা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরা পুরোনো কাগজপত্র ঘেঁটে চলেছেন আন্তু শেখ। জন্মসনদ, পরিচয়পত্র ও নানা সরকারি নথি নিয়ে দিনের পর দিন প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, তিনি ভারতের বৈধ নাগরিক। ৪০ বছর বয়সি এই রেলওয়ে নির্মাণ শ্রমিকের জীবন কাটে এক প্রকল্প থেকে আরেক প্রকল্পে ছুটে বেড়িয়ে। কিন্তু এবার কাজের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে নিজের নামটি ফিরিয়ে আনার লড়াই। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ার পর থেকেই তিনি আশঙ্কা করছেন, শুধু ভোটাধিকার নয়, একে একে হারিয়ে যেতে পারে তার সরকারি নানা অধিকার ও সুযোগ-সুবিধাও। আন্তু শেখ একা নন। এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ নাম। বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে নাগরিক অধিকার, কল্যাণমূলক সুবিধা এবং বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি। মঙ্গলবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার খবরে উঠে এসেছে এই তথ্য।

গত মাসে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাজ্যে ক্ষমতায় আসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ক্ষমতায় আসার পরই পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা আর ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য রেশন এবং কয়েকটি সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত রাজ্য নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) কর্মসূচির আওতায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। মৃত, ডুপ্লিকেট ও সন্দেহভাজন ভোটারদের শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে চালানো এই কার্যক্রমে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার দাবি করে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’দেরও শনাক্ত করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

অনিশ্চয়তার মধ্যেই বসবাস : ৪ জুন খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তর এসআইআরে বাদ পড়াদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করার নির্দেশ দেয়। তবে পরে সরকার জানায়, যারা (প্রায় ২৩ লাখ মানুষ) বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন, তাদের আপিলের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কল্যাণমূলক সুবিধা পেতে থাকবেন। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আপিল করা প্রায় ২৩ লাখ ব্যক্তি শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুবিধা পাবেন।

আন্তু শেখ তাদেরই একজন। তাকে নতুন করে নথি জমা দিতে বলা হয়েছে। একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাকিনা বানো। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো শুনানি ছাড়াই তার আবেদন খারিজ করা হয়েছে। এদিকে নারীদের নগদ সহায়তা কর্মসূচি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ থেকেও এসআইআরে বাদ পড়াদের অযোগ্য ঘোষণা করেছে সরকার।

ধীরে ধীরে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে : ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রভাব শুধু ভোটাধিকারেই সীমাবদ্ধ নয়, বলছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাকিনা বানোর স্বামী হৃদরোগে আক্রান্ত। কয়েক বছর আগে সরকার প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ রুপি ব্যয়ে তার চিকিৎসা ও কার্ডিয়াক ডিভাইসের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু এখন রেশন ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছে তার পরিবার। একই অভিযোগ হুগলির ইমতিয়াজ আহমেদেরও। সরকারি স্কুলের কর্মী হওয়া সত্ত্বেও তার ও ভাইয়ের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আপিল খারিজ হওয়ার পর এখন নতুন করে নথি জমা দিতে বলা হয়েছে। ইমতিয়াজের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত রেশনসহ সব সরকারি সুবিধাই হারাতে পারেন তারা। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা হলো, এখন রেশন কার্ড। ধীরে ধীরে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’

সাংবিধানিক প্রশ্ন ও আইনি লড়াই : সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধার সঙ্গে ভোটার তালিকাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে বিপজ্জনক নজির বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমবঙ্গ খেতমজুর সমিতি ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ভারতের সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করেছে। তাদের দাবি, এতে ৩৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে সুপ্রিমকোর্ট জরুরি শুনানি না নিয়ে আবেদনটি কলকাতা হাইকোর্টে করার নির্দেশ দেন। আইনজীবী ও অধিকারকর্মী সঞ্জয় হেগড়ের মতে, ভারতের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোটার তালিকার সঙ্গে সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধার কোনো আইনি সম্পর্ক নেই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সমতার নীতির পরিপন্থি এবং ভবিষ্যতে সরকারকে ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ করে দিতে পারে। এদিকে ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহালের আবেদনকারীদের আইনজীবী আসিফ রেজার অভিযোগ, অনেক আবেদন যথাযথ শুনানি ছাড়াই নিষ্পত্তি হচ্ছে। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ-ছয়টি মামলার শুনানি হওয়ায় লাখো মানুষের আবেদন নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।

এসআইআর নিয়ে ক্ষোভ ও সমালোচনা : এসআইআর প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের বিশিষ্ট কল্যাণ অর্থনীতিবিদ জ্যাঁ দ্রেজ। তার মতে, এটি একটি ‘অদক্ষ, অবিশ্বস্ত ও কর্তৃত্ববাদী’ উদ্যোগ, যার ফলে অন্যায়ভাবে লাখো মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। সেই একই তালিকার ভিত্তিতে রেশন ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা বন্ধ করা হলে তা ‘তাদের ক্ষতের ওপর লবণ ছিটিয়ে দেওয়ার’ মতো অবস্থা হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ-সদস্য সাগরিকা ঘোষও এ সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, ত্রুটিপূর্ণ ও তাড়াহুড়ো করে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে মানুষের খাদ্য ও কল্যাণমূলক সুবিধা কেড়ে নেওয়া যায় না। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা আবদুল বারির প্রশ্ন, যথাযথ যাচাই ছাড়াই নাম বাদ পড়লে মামলা জিতলেও তা আবার ভোটার তালিকায় ফিরবে এমন নিশ্চয়তা কোথায়? তার ভাষায়, ‘ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা মানেই আমি নাগরিক নই, এমন নয়; আর ভোট দিতে না পারলে আমাদের না খেয়ে থাকারও কথা নয়।’