সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথ যত এগোচ্ছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে এর আর্থিক ও প্রশাসনিক হিসাব। বেতন কমিশনের সুপারিশ, সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রভাব এবং ভাতা কাঠামো—সবকিছু সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সচিব কমিটি। ফলে নতুন পে-স্কেল কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশ বর্তমান সরকার হুবহু বাস্তবায়ন করতে পারছে না। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে মূল বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধায় কাটছাঁটের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পে-স্কেল এক ধাপে নাকি দুই বা তিন ধাপে কার্যকর করা হবে, সেটিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সোমবার (৬ জুলাই) সচিবালয়ে সচিব কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিটির সদস্যদের মতে, সুপারিশ চূড়ান্ত করতে আরও অন্তত দুটি বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর অর্থমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে। সরকারের অনুমোদনের পরই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

আরও পড়ুন

আর্থিক সংকটে নতুন পে-স্কেলে আসছে কাটছাঁট

বৈঠকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। সে অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাই কমিশনের সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের ১ জুলাই অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা কার্যকরের চিন্তা করা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তব হিসাব-নিকাশে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন এতটাই বেড়েছে যে কমিশনের সুপারিশের মাত্র অর্ধেক কার্যকর করলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুবই সামান্য হবে। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোর তুলনায় আর্থিক অসঙ্গতিও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ কারণে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়নের একটি বিকল্প প্রস্তাবও এখন আলোচনায় রয়েছে।

সর্বশেষ আলোচনায় এমন একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে ১ জুলাই থেকেই নতুন মূল বেতন কার্যকর ধরা হবে এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা চালু করা হবে। তবে সচিব কমিটির সদস্যরা বলছেন, প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা বিবেচনায় প্রয়োজন হলে তিন ধাপেও বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।

সচিব কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটি এখনো সুপারিশমালা চূড়ান্ত করেনি। বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ চলছে। আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ সব দিক বিবেচনা করেই সুপারিশ দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

দুই ধাপে নতুন পে-স্কেল, কমছে বেতন বৃদ্ধি

এদিকে সরকার ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে বলে জানালেও এখনো গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন। তারা প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকায় বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছেন না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলেও প্রশাসনিক আদেশ, গেজেট প্রকাশ এবং সফটওয়্যার হালনাগাদসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া বর্ধিত বেতন ও ভাতার অর্থ বকেয়াসহ অক্টোবর মাসে একসঙ্গে পরিশোধের সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

নতুন পে-স্কেল জুলাই থেকেই, বাজেটে আসছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসন খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে।

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধি এবং নতুন যাতায়াত ভাতা চালুরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় এসব সুপারিশের বেশ কয়েকটিতে পরিবর্তন আনার দিকেই এগোচ্ছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া।

এমএএস/এমএমকে