‘বাচ্চাদের কথা দিয়েছিলাম, পেঁয়াজের চালান বিক্রি করে ইলিশ কিনে খাওয়াবো। কিন্তু দুই মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেও এক কেজি ইলিশ কিনতে পারলাম না।’

কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পেঁয়াজ চাষি আব্দুল হালিম মিয়া। চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। প্রকৃতির অনুকূলে ফলনও হয়েছে বাম্পার। কিন্তু বাজারে এসে সেই আনন্দ এখন পরিণত হয়েছে হতাশা আর অনিশ্চয়তায়।

আব্দুল হালিম মিয়ার এই হতাশা শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়, এটি এখন রাজশাহীর হাজারো পেঁয়াজ চাষির বাস্তব চিত্র। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজের ব্যাপক উৎপাদন হলেও নজিরবিহীন দরপতনের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন হাটে বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে আগামজাত বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ। মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন, যার মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজেরও ভালো ফলন হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদনের দিক থেকে এটি একটি সফল মৌসুম হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কৃষকদের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে।

পেঁয়াজে স্বপ্নভঙ্গ কৃষকের

কৃষকদের অভিযোগ, অন্য বছর এসময় প্রতিমণ পেঁয়াজ ২৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার জাতভেদে দাম নেমে এসেছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। ফলে প্রতি মণে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দাম পাচ্ছেন তারা। উৎপাদন খরচই উঠে না আসায় হাজারো কৃষক এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন। দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে অনেক পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে, আবার শুকিয়ে ওজনও কমে যাচ্ছে। বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

জেলার অন্যতম বৃহৎ পেঁয়াজের হাট দুর্গাপুর সদর সিংগাবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দাম কমে যাওয়ায় চাষিদের মধ্যে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। ট্রাক, নসিমন ও ভ্যানে করে পেঁয়াজ নিয়ে আসা কৃষকদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেক কৃষক পচনের আশঙ্কায় লোকসান জেনেও দ্রুত পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আজিজুল হক বলেন, ‘দাম স্বাভাবিক না হলে আমি আর পেঁয়াজ চাষ করব না। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন কমেছে, আবার অনেক পচেও গেছে। বাজারে এসে ভালো দামও মিলছে না। এর মধ্যে সার ও ওষুধের দোকানে হালখাতার চাপ। উৎপাদন ব্যয় তোলাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।’

পবা উপজেলার পেঁয়াজচাষি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারে এসে দেখি দাম একেবারেই নেই। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরিও ঠিকমতো ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করা খুব কঠিন হয়ে যাবে।’

কৃষকদের তথ্যমতে, নিজস্ব জমিতে প্রতি বিঘা পেঁয়াজ চাষে খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। আর লিজ নেওয়া জমিতে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। শুধু জমির ভাড়াই বিঘাপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়। এ অবস্থায় ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষ ছেড়ে বিকল্প ফসল বা পেশার দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোহনপুর উপজেলার কৃষক আব্দুস সামাদ বলেন, ‘পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে গিয়ে অনেক ক্ষতি হয়েছে। কয়েক মাস ধরে আশা করেছিলাম দাম বাড়বে, কিন্তু উল্টো আরও কমে গেছে। এখন লোকসান দিয়েই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।’

দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক নূর ইসলাম বলেন, ‘জমি লিজ, সার, বীজ আর শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ করেছি। এখন যে দাম পাচ্ছি, তাতে মূলধনই ফেরত আসছে না। কৃষকের উৎপাদনের নিশ্চয়তা আছে, কিন্তু লাভের কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

পেঁয়াজে স্বপ্নভঙ্গ কৃষকের

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পেঁয়াজ বাজারে মূল্য অস্থিরতার অন্যতম কারণ হলো একই সময়ে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ কৃষক ফসল কাটার পরপরই বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে একদিকে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায়, অন্যদিকে দাম কমে যায়। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় প্রতিবছরই কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন।

ইশ্বরদীতে বাবার সঙ্গে পেঁয়াজ চাষ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. বাপ্পি। তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। দুই মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেও এক কেজি ইলিশ মাছ কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবো কি না, সেটাই ভাবছি। সরকার যদি কৃষকদের নিয়ে না ভাবে তাহলে কৃষকরা যাবে কোথায়? কৃষকরা বাঁচলেই দেশ বাঁচবে।’

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে পারেন। এর ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে গিয়ে আবারো বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ জরুরি।

দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহারা পারভীন লাবনী বলেন, বাজারে বর্তমানে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে। পচনের আশঙ্কায় অনেক কৃষক দ্রুত বিক্রি করছেন, ফলে দর আরও কমে যাচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে পেঁয়াজ কিনতে আমরা সরকারের উপর মহলকে জানিয়েছি। কারণ কৃষকদের বাঁচাতে না পারলে দেশ বাঁচানো অসম্ভব।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পরিচর্যা শাখার পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, পেঁয়াজ সারা বছরই খাওয়া হয়। কিন্তু সবাই যদি একই সময়ে বিক্রি করতে চান, তাহলে বাজারদর কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই ফসল কাটার পরপরই উৎপাদন খরচ উঠে আসবে- এমন আশা সব সময় বাস্তবসম্মত নয়।

এফএ/এএসএম