সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) হয়েছে প্রায় আট বছর আগে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রতিনিধিদল এই সম্ভাব্যতা যাচাই করে। কিন্তু দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকারের ‘সবুজ সংকেত’ পেলেই সিরাজগঞ্জের আকাশে ডানা মেলবে নতুন এক সম্ভাবনার পায়রা। বদলে যাবে যমুনাপাড়ের চিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সিরাজগঞ্জে নতুন বিমানবন্দর তৈরি করতে উল্লাপাড়া রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চৈত্র্যহাটি মৌজার প্রায় ১০০ একরেরও বেশি অর্পিত সম্পত্তি পরিদর্শন করে ছয় সদস্যের বেবিচক প্রতিনিধিদল। এতে নেতৃত্ব দেন বেবিচকের পরিচালক (এটিএস অ্যান্ড এরোড্রামস) নুরুল ইসলাম।
আরও পড়ুন‘দেশে বর্তমানে মোট ১২টি বিমানবন্দরের মধ্যে ছয়টি দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। এর মধ্যে চারটি উত্তরাঞ্চলে এবং বাকি দুটি কুমিল্লা ও মৌলভীবাজারের শমসেরনগরে অবস্থিত। এসব বিমানবন্দরের অনেকগুলোই ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে চালু ছিল’
লাগেজ রাখার জায়গা নেই, যাত্রীও নেই শাহজালালের ফ্রি শাটল বাসে
ওইসময় তৎকালীন উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু সুফিয়ান, সলপ ইউপি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শওকত ওসমান ও রামকৃষ্ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারপোর্ট সূচকে ‘সিরাজগঞ্জ বিমানবন্দর’ নামে একটি কোড (SAJ) থাকলেও বর্তমানে এটি বন্ধ বলে দেখানো হচ্ছে/ছবি-জাগো নিউজ
এ বিষয় জানতে সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে কথা হয় উল্লাপাড়া ইউএনও মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে বর্তমানে কোনো কার্যক্রম চলমান নেই। তবে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে অবশ্যই সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।’
‘ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-অর্থনীতি ও কৃষিতে সিরাজগঞ্জ এগিয়ে রয়েছে। দেশ ও বিদেশের বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তারা শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আসছেন। ফলে ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সিরাজগঞ্জে বাণিজ্যিক বিমানসেবা চালু করা জরুরি’
এদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারপোর্ট সূচকে ‘সিরাজগঞ্জ বিমানবন্দর’ নামে একটি কোড (SAJ) থাকলেও বর্তমানে এটি বন্ধ বলে দেখানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন
শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্রি শাটল সার্ভিস চালু
দেশের ৬ বিমানবন্দর বন্ধ, চারটি উত্তরাঞ্চলে
দেশে বর্তমানে মোট ১২টি বিমানবন্দরের মধ্যে ছয়টি দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। এর মধ্যে চারটি উত্তরাঞ্চলে এবং বাকি দুটি কুমিল্লা ও মৌলভীবাজারের শমসেরনগরে অবস্থিত। এসব বিমানবন্দরের অনেকগুলোই ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে চালু ছিল।
বেবিচক জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এসব বিমানবন্দরের একটি মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই এখনো শেষ হয়নি। অবকাঠামো, বাজার চাহিদা, জমি অধিগ্রহণ ও ব্যয় নির্ধারণের জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, শুরুতে বগুড়া বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করেই কাজ এগোচ্ছে।
বর্তমানে কক্সবাজার, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুর, সিলেট ও বরিশাল বিমানবন্দর সচল রয়েছে। এসব রুটে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন এয়ারলাইন্স নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
‘দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে অতীতের প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। তাই যেসব বিমানবন্দর চালু করা হলে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচলের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে, শুধু সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে’
যে কারণে গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তরাঞ্চল
উত্তরাঞ্চলে এরইমধ্যে বড় পরিসরে শিল্পায়ন শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতু এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিসিক শিল্পপার্ক গড়ে উঠছে। কুড়িগ্রামে ভুটানমুখী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিকল্পনায় রয়েছে। রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় নতুন প্রকল্প চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিমান যোগাযোগ উন্নত হলে এসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বহুগুণ বাড়বে।
আট বছর আগে বিমানবন্দরের জন্য সম্ভাব্য জায়গা পরিদর্শন করে বেবিচক প্রতিনিধিদল/ছবি-জাগো নিউজ
বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য কাজী সোহেল রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-অর্থনীতি ও কৃষিতে সিরাজগঞ্জ এগিয়ে রয়েছে। দেশ ও বিদেশের বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তারা শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আসছেন। ফলে ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সিরাজগঞ্জে বাণিজ্যিক বিমানসেবা চালু করা জরুরি।’
আরও পড়ুন
বাণিজ্যমন্ত্রী / বিমানবন্দরে কার্গো জট নিরসনে ছুটির দিনেও সেবা চালু রাখতে চায় সরকার
সময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘সড়কপথে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ আসতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। এই পথের ভোগান্তির কারণে বিদেশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও রপ্তানিকারকরা আসতে চান না। বিদেশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা না এলে বিসিক শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন তেমন কাজে আসবে না। তাছাড়া কিছু মানুষ সড়কপথে ঢাকায় যাতায়াত করতে চান না। তারা বিমানে চলতে চান।’
সিরাজগঞ্জ হোটেল ব্যবসায়ী ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার বিদেশি ও পর্যটক সিরাজগঞ্জে আসেন। ঐতিহ্যের স্মারক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ জেলায় দর্শনীয় স্থানের কোনো অভাব নেই। এখানে যমুনা সেতু থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এবং ঐতিহাসিক মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। যে কারণে প্রায়ই বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা দেখা যায়।
চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জে বিসিক শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ছোট-বড় অন্তত দেড় থেকে দুই শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। যার মধ্যে দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা মিল্কভিটা, স্পিনিং মিল, জাতীয় জুট মিল (বর্তমানে বন্ধ রয়েছে), গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ও এসিআই মিল রয়েছে। এছাড়া কুটির শিল্প ২৪ হাজার ৩১৬টি, ক্ষুদ্র শিল্প এক হাজার ৪৬টি, মাঝারি শিল্প ৬৮৮টি ও বৃহৎ শিল্প রয়েছে তিনটি।
আরও পড়ুন
কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবি এমপি মনিরুল হকের
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় যেতে সড়কপথে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। বিমান যোগাযোগ চালু হলে সময় ও খরচ উভয়ই কমবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে। বিদেশি ব্যবসায়ীর আগমন সহজ হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রচুর কৃষিপণ্য ঢাকায় পাঠানো হয়। যানজট ও পরিবহন জটিলতার কারণে অনেক সময় ক্ষতি হয়। বাণিজ্যিকভাবে বিমানসেবা চালুর মতো সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ সিরাজগঞ্জে রয়েছে। এটি চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাবনার দুয়ার আরও বড় হবে। এতে ব্যবসার গতি ফেরার পাশাপাশি তাঁত শিল্প, মৎস্য ও শস্যভান্ডার খ্যাত সিরাজগঞ্জে দেশি-বিদেশি বিনোয়োগকারীদের জন্য অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে অতীতের প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। তাই যেসব বিমানবন্দর চালু করা হলে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচলের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে, শুধু সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’
এসআর/জেআইএম








