দেশে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে সরকার, শিল্প উদ্যোক্তা ও একাডেমিয়ার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, মানসম্মত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

শনিবার (২৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

বৈঠকে ইলিয়াছ মৃধা বলেন, দেশে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের যাত্রা ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। প্রাণ গ্রুপ প্রথমে আনারসের ক্যান্ডি উৎপাদন শুরু করলেও দেশে স্যানিটারি ক্যান শিল্প না থাকায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বিদেশ থেকে ক্যান আমদানি করে উৎপাদন ও রপ্তানি করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়।

প্রাণের এমডি ইলিয়াছ মৃধাগোলটেবিল বৈঠকে প্রাণ গ্রুপের এমডি ইলিয়াছ মৃধা/ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, বর্তমানে রপ্তানি বাজারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ (পেস্টিসাইড রেসিডিউ)। বিদেশি ক্রেতারা এখন পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। কোনো ঝুঁকি নিয়ে পণ্য রপ্তানি করলে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের বাদামে অ্যাফলাটক্সিন থাকার কারণে স্থানীয় বাদাম ব্যবহার করে ইউরোপে চানাচুর রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না উল্লেখ করে ইলিয়াছ মৃধা বলেন, বিদেশি বাদাম আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করার পর রপ্তানি করতে হচ্ছে। একইভাবে দেশের মসলা ব্যবহার করে ইউরোপে নুডলস রপ্তানিও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ মসলাকে গামা রেডিয়েশনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে গামা রেডিয়েশন প্ল্যান্ট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছেন।

ফল রপ্তানিতে শুধু উড়োজাহাজের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বে অধিকাংশ ফল ও সবজি আইকিউএফ পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়। তাই কোল্ড চেইন ও হিমাগার অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন

পাহাড়ে বাড়ছে ফলের উৎপাদন, চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা

ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ সারিতে, প্রক্রিয়াজাতকরণে নেই গতি

ইলিয়াছ মৃধা বলেন, দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য বিশেষায়িত ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেখানে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাব) স্থাপন করা হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও স্বল্প খরচে মান পরীক্ষার সুবিধা নিতে পারবেন। একটি আধুনিক ল্যাব স্থাপনে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, যা এককভাবে এসএমই উদ্যোক্তার পক্ষে সম্ভব নয়।

কোল্ড স্টোরেজ সংকটের কারণে আমের পাল্প সংরক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে বলে জানান প্রাণ গ্রুপের এমডি। তিনি বলেন, বর্তমানে আলুর কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়। সে কারণে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের আহ্বান জানান তিনি।

কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইলিয়াছ মৃধা বলেন, নিরাপদ খাদ্য ও রপ্তানি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্যাকেজিং প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য ভারতের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।

ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন: ইলিয়াছ মৃধাজাগো নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রাণ গ্রুপের এমডি ইলিয়াছ মৃধা/ছবি: জাগো নিউজ

ইলিয়াছ মৃধা বলেন, থাইল্যান্ডে রাজপরিবারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন হয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন।

বিসিকের আদলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য পৃথক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলারও প্রস্তাব দেন তিনি। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবা সহজেই পেতে পারেন।

ইলিয়াছ মৃধা বলেন, লেবু, সাতকড়া, নাগা মরিচ ও মরিচের আচারসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব পণ্য রপ্তানিতে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।

আরও পড়ুন

ফল প্রক্রিয়াজাতে প্রশিক্ষণ আছে, নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি সহায়তা

কাঁঠালের চিপস-আচার রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপে

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, অর্থায়ন ও বাণিজ্য সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্যোক্তারা কম সুদে ঋণ ও ট্যাক্স হলিডে সুবিধা পেলেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির অভাবে অনেক বাজারে বাংলাদেশি পণ্য শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন প্রাণ গ্রুপের এমডি। বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক খাদ্যমেলায় অংশগ্রহণ, ট্রেড অ্যালায়েন্স সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজার তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

jagonews24জাগো নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রাণ গ্রুপের এমডি ইলিয়াছ মৃধা/ছবি: জাগো নিউজ

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি), হালাল সার্টিফিকেশন, বিআরসিসহ আন্তর্জাতিক মান সনদ অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রাণ গ্রুপের এমডি। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে শিল্প উদ্যোক্তাদের সচেতনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, নীতিনির্ধারক, সরকার, শিল্প উদ্যোক্তা ও একাডেমিয়ার সমন্বয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।

ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন: ইলিয়াছ মৃধাজাগো নিউজ আয়োজিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।

এসএম/ইএ/এমএফএ