বাংলাদেশের ফল ও কৃষিপণ্য রপ্তানি খাত ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বিশেষ করে দেশীয় আম, কাঁঠাল, লটকন, আমড়া, লেবু, চালতা ও কাঁচা সবজির চাহিদা বাড়ছে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে। তবে রপ্তানির এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে উন্নত প্যাকেজিং, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিমান ভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএম ইমপেক্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মর্তুজা রহমান জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় ফল রপ্তানি করছে। ইতালিতে রপ্তানি সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে আম, কাঁঠাল, লটকন, চালতা, লেবু, আমড়া ও অন্যান্য দেশীয় ফল বিদেশে পাঠিয়েছি। বর্তমানে আম ও কাঁঠালের মৌসুম চলছে। পরে বিভিন্ন ধরনের সবজি রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে।’

ফল রপ্তানিতে বড় বাধা বিমান ভাড়া, প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়ন

রপ্তানিকারকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন রপ্তানি ফল হচ্ছে আম। এছাড়া কাঁঠাল, লটকন, কাঁচা সবজির উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে এসব ফলের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

ফল রপ্তানির প্রক্রিয়া সম্পর্কে তপন ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি উত্তম কুমার সাহা বলেন, ‘রাজশাহীর বিভিন্ন বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে প্রথমে আমাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে আনা হয়। এরপর আম ধোয়া, গ্রেডিং ও বাছাই করা হয়। পরে মানসম্মত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বিমানবন্দরে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে বিদেশে রপ্তানি করা হয়।’

তিনি জানান, রপ্তানির আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ফলের গুণগত মান পরীক্ষা করেন। সবকিছু ঠিক থাকলে ফাইটোস্যানিটারি বা কোয়ারেন্টাইন সনদ দেওয়া হয়। এই সনদ ছাড়া কোনো ফল বিদেশে পাঠানো সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

১৩ হাজার কোটি টাকার আমের বাজারে রপ্তানি তলানিতে

আমসহ কৃষিপণ্য রপ্তানির সব বাধা দূর করা হবে: কৃষিমন্ত্রী

রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজে ফল ও কাঁচা সবজি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। রোগাক্রান্ত, পোকায় আক্রান্ত বা মানহীন ফল বাছাইয়ের সময় বাদ দেওয়া হয়।

আরআর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাকিবুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘একটি লেবু বা অন্য কোনো ফল কেন রপ্তানির জন্য বাতিল হবে, তা নিয়ে আমাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ক্যাঙ্কার, স্ক্যাব, পোকার আক্রমণ কিংবা বিভিন্ন ধরনের দাগ থাকলে সেই ফল রপ্তানির জন্য গ্রহণ করা হয় না।’

তিনি জানান, ফল ও সবজির রোগবালাই, মান নির্ধারণ, প্যাকেজিং এবং বাছাই পদ্ধতি নিয়ে প্রায় প্রতি মাসেই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আরও আধুনিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

ফল রপ্তানিতে বড় বাধা বিমান ভাড়া, প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়ন

রপ্তানিকারকদের মতে, গত কয়েক বছরে দেশীয় ফলের প্যাকেজিং ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় বড় সুপারশপে প্রবেশ করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও উপস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

এনজি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্যাকেজিংয়ের বিকল্প নেই। বিশেষ করে প্যাকেজিং, বাছাই এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রস্তুতের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে পণ্যের মান আরও উন্নত হবে।’

আরও পড়ুন

এক যুগে দেশে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৫০ লাখ টন

কাঁঠাল হতে পারে রপ্তানি আয়ের নতুন দিগন্ত

তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের আম যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে বাজারে যাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং দেশীয় আমের রপ্তানি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ বিমান ভাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় রপ্তানিকারকদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়।

ফল রপ্তানিতে বড় বাধা বিমান ভাড়া, প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়ন

কার্গোর ভাড়া বেড়েছে প্রায় তিনগুণ

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশ থেকে ফল ও সবজি রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ পরিবহন ব্যয় বা এয়ার ফ্রেইটের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপগামী কার্গোর ভাড়া প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। আগে যে পরিবহন ব্যয় ১০০ টাকা ছিল, এখন তা ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে ইউরোপে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মতো ভাড়া গুনতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা মূলত ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন। কিন্তু আমাদের এয়ার ফ্রেইট প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। একই ধরনের ফল বা সবজি অন্য দেশের রপ্তানিকারকরা কম খরচে বাজারে পৌঁছে দিতে পারছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি পড়ে যাচ্ছে এবং আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।’

আরও পড়ুন

সবজি-ফল রপ্তানি বাড়াতে এয়ার-কার্গো সহজলভ্য করার দাবি

পণ্য রপ্তানিতে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে বেশি প্লেনভাড়া বাংলাদেশে

দেশের শীর্ষ ফল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান লী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশ থেকে ফল ও শাকসবজি রপ্তানি কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিমান পরিবহন খরচ (এয়ার ফ্রেইট) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া। আগে প্রতি কেজি পণ্যের এয়ার ফ্রেইট ছিল প্রায় ২৫০ টাকা। পরে তা বেড়ে ৩২০ টাকায় ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের অজুহাতে এই ভাড়া আরও বেড়ে বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৫৪৭ টাকায় পৌঁছেছে। এত বেশি পরিবহন খরচ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এমএম ইমপেক্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মর্তুজা রহমান বলেন, ‘বিমান ভাড়া কমানো গেলে বাংলাদেশের ফল ও সবজি রপ্তানি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের কৃষিপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’

একই ধরনের মত দিয়েছেন আরআর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাকিবুল ইসলাম সুজনও। তিনি বলেন, ‘বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্ডার পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক সময় সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ক্রেতারা অন্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন।’

ফল রপ্তানিতে বড় বাধা বিমান ভাড়া, প্রয়োজন অবকাঠামো উন্নয়ন

বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সমস্যা

বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন রাকিবুল ইসলাম সুজন। তার ভাষায়, ‘একটি চালান পাঠাতে অনেক সময় ৫০টির মতো ট্রলি প্রয়োজন হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত ট্রলি পাওয়া যায় না। ফলে স্ক্যানিং ও লোডিংয়ে বিলম্ব হয় এবং অনেক সময় নির্ধারিত ফ্লাইটও মিস হয়ে যায়।’

আরও পড়ুন

আমের উৎপাদন বৃদ্ধির আশার মধ্যেও রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা

ফল-সবজির উৎপাদন ও রপ্তানির সম্ভাবনা

উৎপাদন পর্যায়ে মাননিয়ন্ত্রণ

অন্যদিকে, উৎপাদন পর্যায়ে মাননিয়ন্ত্রণ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তপন ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি উত্তম কুমার সাহা। তিনি বলেন, ‘শুধু রপ্তানির সময় নয়, বাগান পর্যায় থেকেই তদারকি বাড়াতে হবে। গাছে কী ধরনের রোগবালাই হচ্ছে এবং ফলের মান কেমন হচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে হবে। উৎপাদনের শুরু থেকেই মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, আধুনিক প্যাকেজিং, উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রশিক্ষণ, বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিমান ভাড়া কমানো গেলে বাংলাদেশের ফল ও কৃষিপণ্য রপ্তানি খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে দেশের কৃষি রপ্তানি শিল্প আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করবে।

কেএমএ/এমএমএআর/ এমএফএ