সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যে কোনো আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। সম্প্রতি ‘ফার্মের মুরগি’ বিতর্ক যেন নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করছে। কেননা ১৩ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ‘বয়লার চিকেন পার্টি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ। টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এর সূত্রপাত। পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমালোচনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ফোনালাপের ভিডিও।
রাজধানীর সিটি কলেজের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক মন্ত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করেন। সেই কথোপকথন অন্য একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয় এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে পরীক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো তো ফার্মের মুরগি। একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসে।’
একই কথোপকথনে তিনি দাবি করেন, পরীক্ষা স্থগিতের পক্ষে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মত দিয়েছিলেন। তবে জেলা প্রশাসক, শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, রুটিন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছিল এবং তিনিও পরীক্ষার্থীদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
ফোনালাপের ভিডিওটি ১৩ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ‘ফার্মের মুরগি’ শব্দবন্ধটি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে মন্তব্যটি অবমাননাকর বলে মনে হয়। ফলে ১৪ জুলাই সকাল থেকেই রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ, উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যায়, ‘আমি কে, তুমি কে, ফার্মের মুরগি’ স্লোগান। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। পরে চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও একই দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশের খবর পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন
উদয় রহমানের ভাইরাল গল্প ‘সুর’ নিয়ে কেন তোলপাড়
এই ঘটনার আবহ ধরেই ১৩ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ‘বয়লার চিকেন পার্টি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ। প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত পেজটির প্রোফাইল ছবির পোস্টটি ১৩৫ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। পেজটিতে আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও, বিভিন্ন স্থানের কর্মসূচির আপডেট, ব্যঙ্গধর্মী পোস্ট এবং হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিরোনামে পোস্টও প্রকাশ করছে পেজটি।
পেজটি শেয়ার করে অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লাবীব মুহান্নাদ একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম অন্যায় দেখলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মনসুর আব্দুল্লাহ লিখেছেন, ‘Some students opened a Broiler Chicken Party in response to the Education Minister calling the generation as Broiler Chicken.’

সাংবাদিক জামিল আক্তার লিখেছেন, ‘বয়লার পার্টি এসে গেছে। ককরোচ পার্টির মতো কি এটা জমবে?’ একইভাবে জুয়াইয়া নওশীন লিখেছেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি থেকে উদ্বুদ্ধ ব্রয়লার চিকেন পার্টি। কী এক জেনারেশনের পাল্লায় যে পড়ছে মুরুব্বিরা, এখনো টের পাচ্ছে না!’
মো. শাহরিয়ার আহমেদ লিখেছেন, ‘৯০ দশের নকল বাবার ধারণাই নাই, কোন জেনারেশনকে উনি লিড দিতে এসেছেন। এরা আদিম যুগের জেনারেশন না যে ভেবে চিন্তে ডিসিশন নেবে। এরা আগে অ্যাকশন, পরে ডিসিশন। কাম অন বয়েজ, ফুল সাপোর্ট। #স্টেপডাউনমিলন।’
আরও পড়ুন
মেয়েদের রেজাল্টের দিন কী হয়েছিল, জানালেন গুলতেকিন
বয়লার চিকেন পার্টি শেষপর্যন্ত সাময়িক অনলাইন প্রতিক্রিয়াই থাকবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে একটি ডিজিটাল রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হবে; তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু মত প্রকাশের জায়গা নয়; নতুন প্রতীক, নতুন স্লোগান এবং নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
এসইউ







