ফিলিস্তিনের গোলরক্ষক সালিম আল-আশকার চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। গত সোমবার এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানিয়েছে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ)। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল সমর্থক, সাংবাদিক, ভক্ত এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে শোক ও শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তবে এই ঘটনার পরও ফিফা এখনো কোনো নিন্দা জানায়নি বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও দেয়নি।
তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, পিএফএর ভাষ্য—৩২ বছর বয়সী সালিম আল-আশকার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর সংগঠনটি জানায়, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯ জনে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে ৫৬৭ জনই ফিলিস্তিনের ফুটবল অঙ্গনের সদস্য।
পিএফএ আরও জানায়, মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেছিলেন আল-আশকার। তাঁর স্ত্রী তাঁদের প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন। আল-আশকারের এক স্বজন ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফাকে জানান, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে হামাদ সিটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেই সময় আল-আশকারের বুকে গুলি লাগে। ওই স্বজন তাঁকে সম্প্রদায়ের ‘সবচেয়ে ভালো তরুণদের একজন’ বলে বর্ণনা করেন।
তাঁর মৃত্যুর খবর দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, কেন এখনো ইসরায়েলকে নিষিদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
চিলির ফুটবল ক্লাব দেপোর্তিভো প্যালেস্টিনো আল-আশকারকে শ্রদ্ধা জানানো প্রথম ক্লাবগুলোর একটি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ক্লাবটি জানায়, ৩২ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় তারা ‘গভীরভাবে শোকাহত।’ একই সঙ্গে তারা বলে, এমন ঘটনা এখনো ঘটছে, এটি ‘হৃদয়বিদারক’ এবং তারা ‘ন্যায়বিচার ও শান্তির’ আহ্বান জানায়।
তুরস্কের যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী ওসমান আশকিন বাকও এক্সে এক পোস্টে আল-আশকারকে শ্রদ্ধা জানান। তিনি শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘হত্যাকারী ইসরায়েলি বাহিনীর’ হাতে এই গোলরক্ষক নিহত হয়েছেন। বাক আরও বলেন, বর্তমানে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে ৫৭২ জন ফুটবলার খেলছেন, আর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৬৭ জন ফিলিস্তিনি ফুটবলার নিহত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘কখনো কখনো সংখ্যা অনেক কিছু বলে দেয়। এটি তেমনই একটি উদাহরণ।’
আল-আশকারের মৃত্যুর পর আবারও ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চলমান বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর মধ্যেই ইসরায়েলকে এখনো নিষিদ্ধ না করায় অনেকেই ফিফার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্প্যানিশ-মরোক্কান ক্রীড়া সাংবাদিক লায়লা হামেদ এক্সে লেখেন, ফিফা ‘প্রায় প্রতি সপ্তাহেই’ বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে স্থগিত করে। কিন্তু ইসরায়েলকে নিয়ে একাধিক বৈঠক করলেও সংস্থাটি বারবার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত গণহত্যা নিয়ে তদন্ত করতে আর কতটা সময় লাগবে?’
আয়ারল্যান্ডের সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য মিক ওয়ালেসও এক্সে দেওয়া পোস্টে ফিফার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সংস্থাটি এতটাই ‘পচে গেছে’ যে এটি ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং নির্মম জায়নবাদী বসতি-ঔপনিবেশিক প্রকল্পের স্বার্থে’ কাজ করছে। তিনি ফুটবলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এ বিষয়ে মুখ খোলার আহ্বান জানান এবং বলেন, এই খেলাটির জন্য ‘নতুন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা’ প্রয়োজন।
সাংবাদিক হাসান মাফি আল-আশকারের মৃত্যুকে সামগ্রিকভাবে ফিলিস্তিনি ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করে এক্সে লেখেন, ‘ফিলিস্তিন বিশ্বকাপে খেলতে পারে না, কারণ জায়নবাদীরা তাদের সব খেলোয়াড়কে হত্যা করেছে।’ লেখক ইয়াকব রাইমানও ফিফার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আল-আশকার নিহত হয়েছেন এমন সময়, যখন তাঁর স্ত্রী তাঁদের প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘ফিফা যদি রাশিয়াকে টুর্নামেন্ট থেকে নিষিদ্ধ করতে পারে, তাহলে এমন জঘন্য কর্মকাণ্ড কীভাবে উপেক্ষা করতে পারে?’ তিনি অভিযোগ করেন, এত কিছুর পরও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ইসরায়েলকে এখনো নিষিদ্ধ করা হয়নি।
স্প্যানিশ সাংবাদিক ফনসি লোয়াইজা আল-আশকারের মৃত্যুর সময়টির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের প্রথম বিভাগের একজন পেশাদার গোলরক্ষককে এমন সময় হত্যা করা হয়েছে, যখন বিশ্বকাপ চলছিল।








