আমার কয়েক দিন ধরেই বাম চোখটা বেশ চুলকাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখের দৃষ্টি 280p রেজোল্যুশনের মতো ঘোলা হয়ে যাচ্ছে । কোনোভাবেই আর ডাক্তার না দেখিয়ে থাকা যাচ্ছিল না। ডাক্তারের সাজেশন নেওয়ার জন্য ফোন দিলাম আমার ফুফাকে। কারণ, দেশের কোন হাসপাতালে কোন ডাক্তার বসেন, কোন ডাক্তার ভালো, কার চেম্বারে গেলে টাকা যাবে নাকি রোগ যাবে এসব বিষয়ে ওনার জ্ঞান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চেয়েও আপডেটেড। সমস্যার কথা শুনেই যেন চলমান আগুনে উনি পেট্রল পেয়ে গেলেন। ফোনের ওপাশ থেকে সিরিয়াস কণ্ঠে বললেন, ‘শোন, ডাক্তারকে বলবি এই চোখের সমস্যার কারণেই তুই অন্যদের মতো আর্জেন্টিনার ক্লিন ফাউলগুলো দেখতে পাচ্ছিস না।’

‘আমার তো চোখের সমস্যাটা একটা চোখের ড্রপ দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তোমার যে মেমোরি লস হয়ে যাচ্ছে দিন দিন, সেটার কী হবে?

‘কেন, আমি কি কিছু ভুলে গেছি নাকি?’

‘আজকে যে তোমাদের ৭ গোল খাওয়ার এক যুগ পূর্তি সেটা তো ভুলেই গেছ। সেটা নিয়ে...

টুট টুট.... (ফোন কেটে দিল)

ফুফার মেজাজটাই আবার খারাপ হয়ে গেল বোধ হয়। প্রতি পরিবারে কিছু অভিমানী ফুফা থাকে, যাদের রাগ করতে কোনো উপলক্ষ লাগে না। আমার এই ফুফা তেমন না! আমরা নিজেদের ভালো চাইলে ওনাকে রাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ, উনি যার ওপর রাগেন, তার কপাল খুলে যায়; আর যার প্রশংসা করেন, তার কপাল পুড়ে যায়। এই যেমন ওনাকে রাগানোর পর আমার চোখের চুলকানিটা একটু কম মনে হচ্ছে। কালকে নাগাদ ভালোও হয়ে যেতে পারে।

আমার এই ফুফা এমনই কুফা উনি যদি আমাদের কাউকে বলে ‘চিন্তা কোরো না’, তখন থেকেই আমাদের চিন্তাটা শুরু হয়ে যায়। তিনি যাকে সাপোর্ট করেন, ভাগ্যও তাকে আনফলো করে দেয়। বর্ষার টানা বৃষ্টিতে উনি ছাতা নিয়ে বের হলে আকাশ রোদ বের করে দেয়। কারও নতুন জামার প্রশংসা করলে অজানা কোনো পেরেকের সঙ্গে সেটার দেখা হয়ে যায়। নতুন ফোন দেখে ‘বাহ, সুন্দর তো!’ বলার তিন দিনের মধ্যেই ফোনের ডিসপ্লে ফেটে যায়, কারও চুলের প্রশংসা করলে পরদিনই তার হেয়ারফল শুরু হয়! সেদিন নাকি ফুফুকে বলেছে—‘তোমার তো খাওয়ার রুচি বেড়েছে ভালোই’, তারপর থেকেই নাকি ওনার ছোটঘরের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। এমনই বর্ণিল ঘটনাবহুল তার কুফা–জীবন। এই জীবনে তিনি যাকেই সাপোর্ট করেছেন তার খোলা কপালও বন্ধ হয়ে গেছে।

সেটা অবশ্য বোঝা যায় ব্রাজিল টিমের অবস্থা দেখে। তিনি ব্রাজিলের কড়া সমর্থক। ওনার মতো সমর্থক থাকলে ব্রাজিলের শত্রুর দরকার পড়ে না। ছোটবেলায় তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবা, ব্রাজিল সাপোর্ট করো। ফুটবল যদি শিল্প হয়, তাহলে ব্রাজিল তার লেওনার্দো দা ভিঞ্চি।’ আমি ছোট মানুষ। শিল্প-সাহিত্য বুঝি না। ফুফাকে বুঝি। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা, আর তখন আমার ফুটবলীয় সাপোর্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল ফুফা। আমি আসলে ব্রাজিলের না, ফুফার ফাঁদে পড়েছিলাম। সেদিন না বুঝে ব্রাজিল সাপোর্ট করলেও জ্ঞান হওয়ার পর আমি মেসির কড়া ভক্ত। এটা নিয়ে তার আবার বেশ মন খারাপ আমার ওপর!

সন্ধ্যায় ফুফা বাসায় এলেন, মা দরজা নক করে খবরটা জানাতেই বুঝে গেছি ব্রাজিল হারার পর তিনি আইসোলেশন থেকে বের হয়েছেন শুধু আজকে সকালে আমি তাঁকে রাগিয়ে দেওয়ার প্রতিশোধ নিতে। ড্রয়িংরুমে যেতেই দেখি তিনি বেশ উত্তেজিত আর্জেন্টিনার খেলা নিয়ে। ফিফাকে কীভাবে আর্জেন্টিনা কিনে নিল, সেটা নিয়ে অনেক অনেক যুক্তিতর্ক বলেই যাচ্ছেন। আমি তেমন একটা ঘাঁটাচ্ছি না। কারণ, কথার ফাঁকে তিনি যদি ভুলক্রমেও বলে ফেলেন—‘আর্জেন্টিনা তো ভালোই খেলছে, এগুলো করার কী দরকার’, তাহলেই এই নীল দলের কপালে খারাপ আছে। এর মধ্যেই আমাদের অনেক বছরের হেল্পিং হ্যান্ড পারুল চা–নাশতা নিয়ে রুমে ঢুকল। আমাদের সঙ্গে বসে খেলা দেখে দেখে সেও এখন মেসির ভক্ত। এতক্ষণ রান্নাঘর থেকে আমাদের কথাগুলো শুনে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, আপনার কাছে মেসির নাম্বার আছে?’

‘কিহ! কেন?’

‘ওনারে একটা ফোন দিয়া জানাইতেন!’

‘কী জানাইতাম?’

আমার আর ফুফার দুই জোড়া উৎসুক চোখ পারুলের দিকে। সে বলেই যাচ্ছে...

‘মেসির নাম্বারে একটা ফোন দিয়া জানান আমাগো একটা কুফা ফুফা আছে। ফিফারে টেকা না দিয়া কিছু কম টেকা দিয়া হ্যারে কিন্না লইতে কন। ফুফায় যেই দল সাপোর্ট করে হেই দলই তো ফেইল মারে। মেসি যাগো লগে খেলব ফুফায় টেকা খাইয়া হেই দল সাপোর্ট করব আর মেসি জিত্যা যাইব। ফুফার তো কুফা হওয়ার ২৪ বছরের ম্যালা টেরনিং আছে!’

এবার আমি তাকালাম ফুফার দিকে, ওনার হাতের চায়ের কাপ কেঁপে টং টং আওয়াজ তুলছে পিরিচের সঙ্গে লেগে। ঠাস করে চায়ের কাপটা টি–টেবিলে রেখেই সে হনহন করে হাঁটা দিল দরজার দিকে। আম্মা পেছন থেকে ডাকছে, ‘দুলাভাই, ৭টা মিনিট বসে চা–টা শেষ করে যান!’ ফুফা একবার পেছনে চোখ লাল করে তাকাল। আমি নিশ্চিত, পৃথিবীতে ‘৭’ সংখ্যাটা শুনে এত ঘৃণার চোখে আর কেউ কোনো দিন তাকায়নি।