ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময় পার করছে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই হওয়ার পর জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি। বিশেষ করে ঘরবাড়ি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঠান্ডা রাখার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশটিতে এক নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এক সময় এসি ব্যবহারের বিরোধী থাকা পরিবেশবাদী বামপন্থী দলগুলোও এখন আবহাওয়ার কারণে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর প্রয়োজনীয়তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী দলগুলো সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি ভর্তুকিতে ব্যাপক হারে এসি বিতরণের দাবি জানাচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফ্রান্সে ঐতিহাসিকভাবেই এসির ব্যবহার অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। দেশটির মাত্র ২৫ শতাংশ পরিবারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র রয়েছে, যেখানে প্রতিবেশী স্পেন ও ইতালিতে এই হার ৫০ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে তা ৯০ শতাংশের বেশি।
ফ্রান্সের সিংহভাগ স্কুল ও হাসপাতালেও এসি নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক দাবদাহের কারণে দেশটির হাজার হাজার স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীরা এসি ছাড়া অসহনীয় পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এর মধ্যে রাতে ঘুমানো ও শিশুদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে পোর্টেবল বা বহনযোগ্য এসি কেনার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে।
এই চরম সংকটের মুখে ফ্রান্সের পরিবেশবাদী দল ‘ইকোলজিস্ট’-এর প্রধান মারিন তনদেলিয়ে তাঁর দলের দীর্ঘদিনের এসি-বিরোধী ডগমা বা অন্ধবিশ্বাস ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তিনি স্বীকার করেছেন, স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে এখন এসি লাগানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিছু জায়গায় এটি ছাড়া এখন আর কোনো বিকল্প নেই।
পরিবেশবাদীদের এই অবস্থান পরিবর্তনকে ফ্রান্সে একটি বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এত দিন পর্যন্ত দেশটির গ্রিন বা পরিবেশবাদী আন্দোলনগুলো এসি ব্যবহারকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিকর সমাধান হিসেবে মনে করত। তাদের যুক্তি ছিল, এসি ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই না করে কেবল তার ক্ষতিকর প্রভাব আড়াল করার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে এটি মূল লড়াই থেকে মানুষের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া এসি চালাতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়।
ফ্রান্সে উৎপাদিত বিদ্যুতের সিংহভাগ পারমাণবিক শক্তি থেকে এলেও অন্যান্য দেশে এর জন্য প্রচুর জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হয়। পাশাপাশি এসিতে ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস (গ্রিনহাউস গ্যাস) লিক হয়ে বায়ুমণ্ডলে মেশে এবং এসির বহির্গমন অংশ থেকে নির্গত গরম বাতাস শহরের তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৩ ডিগ্রি বাড়িয়ে দেয়। এই ধারণার কারণে ফ্রান্সের সরকারি নীতিতেও এসিকে নিরুৎসাহিত করা হতো।
দেশটির ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের নিয়মে ইনসুলেশন, গাছপালা লাগানো এবং হাই-টেক বায়ু চলাচল পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হতো যাতে এসির প্রয়োজনই না পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটানি অঞ্চলের নঁত শহরে নির্মাণাধীন একটি বিশালাকার হাসপাতালের কথাই ধরা যাক। হাসপাতালটির শুধু অর্ধেক কক্ষেই এসির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলো এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ বর্তমান তাপমাত্রায় এসি ছাড়া মানিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের রাজনৈতিক ডানপন্থীরা বরাবরের মতোই এসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মেরিন ল্য পেন দেশজুড়ে সব স্কুল ও হাসপাতালে এসি সরবরাহের জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তাঁর দলের মুখপাত্র জঁ-ফিলিপ তাঙ্গি জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনার আওতায় দেশের ৩ থেকে ৪ কোটি বাড়ির মালিকদের এসি কেনার সুবিধার্থে ২০ বিলিয়ন ইউরোর (প্রায় ২২.৭ বিলিয়ন ডলার) সুদমুক্ত সরকারি ঋণের ব্যবস্থা রাখা হবে। তবে সমালোচকেরা ডানপন্থীদের এই পরিকল্পনাকে সুবিধাবাদী এবং অপরিণামদর্শী বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, যারা এত দিন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকে স্বীকার করতেই দেরি করেছে, আজ এর প্রভাব নিয়ে বড় বড় কথা বলার কোনো নৈতিক অধিকার তাদের নেই।
তবে সমালোচনা বা রাজনৈতিক বিতর্ক যে দিকেই যাক না কেন, ফ্রান্সের তাপমাত্রা যেভাবে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা এবং স্কুল-হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখতে দেশটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার যে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর তা এখন বাম-ডান সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করছে।








