ইরাক, সিরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ৫০০ মাইলের এক ঐতিহাসিক পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক মিডল ইস্ট আইকে (এমইই) জানিয়েছেন ইরাকি ও আঞ্চলিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

উত্তর ইরাকের কিরকুক শহর থেকে সিরিয়ার উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইনটি পুনরুজ্জীবিত করার চুক্তিটি আগামী সপ্তাহে প্রকাশ করা হতে পারে। হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির বৈঠকের সময় এটি প্রকাশ করার কথা রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তুরস্কে ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাক বিষয়ক দূত টম বারাক জাইদির সফরের আগেই এই চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ করছেন। এই সফরে মার্কিন জ্বালানি হাব হিসেবে পরিচিত টেক্সাস অঙ্গরাজ্যেও জাইদির যাওয়ার কথা রয়েছে। উর্ধ্বতন সেই ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, বারাক প্রধানমন্ত্রী জাইদির সঙ্গে একটি ভালো কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তিনি এই পাইপলাইনটিকে লেভান্ত অঞ্চলে ব্যবসায়িক প্রকল্পের একটি মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে চান, যা যুক্তরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার—উভয় পক্ষকেই লাভবান করবে বলে তিনি প্রচার করে আসছেন।

১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার এই পাইপলাইনটি তৈরি করেছিল। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া ইরানের পক্ষ নিলে বাগদাদ এই পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে।

লাইনটি চালু করতে নতুন স্টোরেজ ট্যাংক, পাম্প এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাসহ ব্যাপক মেরামতের প্রয়োজন। এক আঞ্চলিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পাইপলাইনটি সম্ভবত পুরোপুরি নতুন করে তৈরি করতে হবে, যাতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। তিনি আরও জানান, এই পুনর্নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কনসোর্টিয়াম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যা এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকেই নির্দেশ করে।

২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার ইসলামপন্থী যোদ্ধারা দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সিরিয়া ও ইরাক এই পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে সেই প্রাথমিক আলোচনা তখন গতি পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর বানিয়াস পাইপলাইনের বিষয়টি নতুন করে জরুরি হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সময় ইরাক সিরিয়ার ভেতর দিয়ে ট্যাংকার ট্রাকে করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করলেও তার পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সারহাং হামাসায়িদ বলেন, ‘ইরাক এখন সিরিয়াকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করেছে। যুদ্ধের আগে এক ধরনের সংশয় ছিল। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরাকের জন্য সিরিয়াকে প্রয়োজন।’

আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইন চুক্তির স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাগদাদ সরকার মূলত শিয়া রাজনৈতিক দল এবং ইরানের ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা এক দশকেরও বেশি সময় আগে আল-কায়েদার সিরীয় শাখা আল-নুসরা ফ্রন্ট গঠন করা সুন্নি মুসলিম শারা-র সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে সতর্ক ছিল।

কিন্তু আসাদকে উৎখাত করার পর শারা যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে প্রবেশ করেন। তুরস্ক এবং কাতার ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘনিষ্ঠ সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর থেকে বেশ কয়েক স্তরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যার মধ্যে শারার সাবেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামও (এইচটিএস) রয়েছে।

গত সপ্তাহে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প শারার বিরল প্রশংসা করে তাঁকে ‘অসাধারণ’ এবং ‘উচ্চ প্রশংসিত’ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছে যে তারা সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকের (এসএসটি) তালিকা থেকে বাদ দেবে, যেখানে ১৯৭৯ সাল থেকে সিরিয়ার নাম ছিল। এই পদক্ষেপ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পাইপলাইন প্রকল্পে কাজ করা সহজ করে তুলতে পারে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরাক সরকার কিরকুক এবং ইরাকের আনবার প্রদেশের তেল হাব হাদিথা থেকে বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য মার্কিন প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল টিআই ও শেভরন এবং একটি কাতারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি হলো ইরাক। দেশটিকে তার ৯৫ শতাংশ তেল রপ্তানির জন্য এই প্রণালির ওপর নির্ভর করতে হয়। ইরাকের কিছু মিলিশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও দেশটি তার তেল রপ্তানি করতে পারছে না। জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা গত মাসে জানিয়েছে, মে মাসে ইরাকের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির পরিমাণ ছিল গত বছরের গড় রপ্তানির মাত্র ৮ শতাংশ। অথচ তেল বিক্রি থেকেই দেশটির রাষ্ট্রীয় বাজেটের ৯০ শতাংশ আসে।