বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে দেশের হিস্যা কমতে শুরু করেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশনের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস ২০২৫: কি ইনসাইটস অ্যান্ড ট্রেন্ডস’ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে তৈরি পোশাক আমদানির বাজার ৫৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ বাজারের আকার বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। কিন্তু, এই সম্প্রসারিত বাজারের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারেনি বাংলাদেশ।
ডব্লিউটিওর তথ্য বলছে, গত বছর বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ৭ শতাংশ থেকে কমে ৬.৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১০.৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ার প্রায় ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ৬ শতাংশ, ভারত ও ইন্দোনেশনের প্রায় ৫ শতাংশ করে। প্রবৃদ্ধির এই ব্যবধান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে গত কয়েক বছরে চীনের বাজার হিস্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও সেই সুযোগ সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। বাংলাদেশ উৎপাদন সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতায় এগিয়ে থাকলেও পণ্য বৈচিত্র্য, দ্রুত সরবরাহ, অবকাঠামো এবং নীতিগত সুবিধায় পিছিয়ে পড়ছে।
ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্ব পোশাক বাজারে চীনের অংশ ছিল প্রায় ৩১.৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে ২৭.৩৫ শতাংশে নেমেছে। তারপরও ১৫৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি নিয়ে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম গত বছর ৩৭.৫১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশটির রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবধান আরো কমেছে।
ভারতও ধীরে ধীরে বাজার সম্প্রসারণ করছে। গত বছর দেশটির পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে কম্বোডিয়া ১১.৫৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ ৭ শতাংশ বেড়ে ৩৪.৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পণ্য বাণিজ্য বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং সেবা বাণিজ্য ৮ শতাংশ। বৈশ্বিক বাণিজ্যে সেবা খাতের অংশীদারিত্ব বেড়ে ২৭.৬ শতাংশে উঠেছে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করছে না। ক্রেতারা দ্রুত সরবরাহ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর কারখানা এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এসব ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, “বাংলাদেশের রপ্তানি এক শতাংশেরও কম বেড়েছে, অথচ প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা।”
তার মতে, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া সরকারি নীতি সহায়তা, দক্ষ মানবসম্পদ, আগ্রাসী বাজার সম্প্রসারণ এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা, বন্দর ও কাস্টমসের জটিলতা কমানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল গ্রহণ। অন্যথায় দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা ভবিষ্যতে আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।








