গত ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিং থেকে দেশে ফেরার ফ্লাইটে ওঠার আগেই তিনি চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্পন্ন করেছেন-প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, এনপিসি স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান চাও লেইজি এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সফরে প্রায় পনেরোটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, একটি বিরল যৌথ ঘোষণাপত্র আদায় হয়েছে এবং তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনের প্রতিশ্রুতি মিলেছে-এমন একটি অর্জন, যা ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতির চার দশকের ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে গেছে। যে কোনো মাপকাঠিতেই এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সফর। তবু এ সফর নিয়ে আলোচনার অধিকাংশ, বিশেষত সীমান্তের ওপারে, আটকে গেছে একটিমাত্র প্রশ্নে : তিনি প্রথমে ভারতে গেলেন না কেন?

এ প্রশ্নের সৎ জবাব দেওয়া জরুরি। কিন্তু এর আড়ালে যে প্রশ্নটি হারিয়ে যাচ্ছে, সেটিই বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ-বাংলাদেশ আসলে কী অর্জন করল, এবং এ সরকার বিশ্বের সঙ্গে কীভাবে চলতে চায়?

‘এড়িয়ে যাওয়া’র আখ্যান যে ভুল ব্যাখ্যা দেয়

ভারতীয় গণমাধ্যম মালয়েশিয়া-চীন সফরের এই ক্রমকে দ্রুতই একটি ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছে। দ্য হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন...ঐতিহ্যগতভাবে এ ধরনের সফরের গন্তব্য ভারতকে এড়িয়ে গিয়ে তার পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার বুঝিয়ে দিয়েছেন।’ দ্য হিন্দু প্রায় একই সুরে বলেছে, এ সফর ‘উদ্বোধনী গন্তব্য হিসাবে প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে গেছে।’ দুটি পত্রিকাই ঠিকভাবে উল্লেখ করেছে যে, তারেক রহমান মার্চে প্রধানমন্ত্রী মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে চিঠি লিখেছিলেন। এসব তথ্যের কোনোটিই মিথ্যা নয়।

কিন্তু যা তারা বলেনি, তা হলো-সফর চূড়ান্ত হওয়ার অনেক আগে ঢাকার সূত্রে জানা গিয়েছিল, সরকার আসলে এই দ্বৈত প্রতিযোগিতাই এড়াতে চাইছিল। মূলত চীনকেন্দ্রিক একটি সফরসূচি বাতিল করে মালয়েশিয়াকে মাঝখানে রাখা হয়েছিল, যাতে গোটা ব্যাপারটা দিল্লি বনাম বেইজিং প্রতিযোগিতার মতো না দেখায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি করার চেয়ে একটি তৃতীয় দেশ অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর এই বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কাউকে অগ্রাহ্য করার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; যদিও এটি অসম্পূর্ণভাবে এই বার্তাই দিতে চায় যে, বাংলাদেশকে এককভাবে কাউকে বেছে নিতে হবে না। এছাড়া দেশে একটি সমান্তরাল আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু বুদ্ধিজীবী এখন চায়ের আড্ডায় তর্ক করছেন-একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়া বা চীনের বদলে মক্কা-মদিনায় হওয়া উচিত ছিল। এ সমালোচনা যেভাবেই বিচার করা হোক, এটি একটা বিষয় স্পষ্ট করে-‘প্রথম সফর’ নিয়ে প্রতীকী আলোচনা ভিন্ন ভিন্ন মহলে কতটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

সফরসূচির চেয়ে অর্জনই বেশি গুরুত্ব দাবি করে

কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা সরিয়ে রাখলে এ সফরের প্রকৃত অর্জন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এটি কেবল তৃতীয়বার যৌথ ঘোষণাপত্র জারির ঘটনা-যা ইঙ্গিত দেয়, এ সফর শুধু প্রকল্প-অর্থায়নের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক গভীরতার জন্যও। একজন গবেষক জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশের বন্ধুত্ব কেবল আর্থিক সহযোগিতায় এগোতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন টেকসই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা। চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত সংযুক্তি ২০১৬ সালের বেল্ট অ্যান্ড রোড সমঝোতার পর কোনো বড় চীনা বৈশ্বিক উদ্যোগে প্রথম অন্তর্ভুক্তি-এই যুক্তিকে স্রেফ কথার বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিতে রূপ দেয়।

এবার আসি তিস্তা প্রসঙ্গে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিস্তার পানিবণ্টন একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে-কীভাবে একটি ছোট রাষ্ট্রের উন্নয়নের চাহিদা একটি বড় প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো, ২০১১ সালের তিস্তা চুক্তি প্রায় হয়েই গিয়েছিল; কিন্তু তা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তিতে ভেস্তে যায়। পরের বাংলাদেশি সরকারগুলো এ শিক্ষা মনে রেখেও অপেক্ষা চালিয়ে গেছে। বর্তমান সরকার পানিসম্পদ মন্ত্রীর মাধ্যমে চীনের লি গুওইংয়ের কাছে সরাসরি অনুরোধ করে এবং তা বেইজিংয়ের ইতিবাচক সাড়ার মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে-নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুরের মতো অঞ্চলের সেচের চাহিদা আর এমন এক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জিম্মায় রাখা হবে না, যা ১৯৮৩ সাল থেকে কোনো অগ্রগতি দেখেনি। তবে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথমদিকে চীনের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি না হওয়া ব্যর্থতা নয়, বরং বাংলাদেশের স্মার্ট কূটনীতিই বলতে হবে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বড় অর্জন হলো চীনের পক্ষ থেকে ইকোনমিক করিডোরের প্রস্তাব। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে স্থলপথে এ করিডোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দেবে।

বিদেশিদের বাংলাদেশকে কীভাবে দেখা উচিত

বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপকে কোনো বড় শক্তি খুশি বা অখুশি হলো সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার একটা প্রবণতা আছে, যা বোধগম্য কিন্তু সীমাবদ্ধ। এ কাঠামো একই ধরনের শিরোনাম তৈরি করতেই থাকবে-‘এড়িয়ে যাওয়া,’ ‘উপেক্ষা,’ ‘পক্ষপাত’; কিন্তু আসল ঘটনাটি ধরতে পারবে না : একটি দেশ তার নিজস্ব উন্নয়ন-অগ্রাধিকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করার চেষ্টা করছে, যে অংশীদারই তা দিতে রাজি, তার কাছ থেকে। একইসঙ্গে বাকি সবার সঙ্গে নিজের পথ খোলা রেখে।

এ ভারসাম্য সরকার কতদিন বজায় রাখতে পারবে, বিশেষত যখন কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর শিলিগুড়ি করিডোরের এত কাছে তিস্তা সহযোগিতার অগ্রগতি ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তা এখনো পরীক্ষার বিষয়। এখানে চীনের নিজস্ব মতামতও শোনার মতো, যারা এই দ্বিমুখী ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলেছে। সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক ছিয়েন ফেং গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন, ভারতের গণমাধ্যম ও কৌশলগত মহলের কিছু অংশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেই আঞ্চলিক বিষয় বিচার করে, যার ফলে চীন-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠতা নিয়ে অমূলক উদ্বেগ তৈরি হয়। তিনি আরও মনে করেন, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ করে নয়, এবং এটিকে কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়।

একজন চীনা পণ্ডিতের জন্য এ কথা বলা সুবিধাজনক বটে, আর তাই এটিকে নির্বিচারে গ্রহণ করাও ঠিক হবে না। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের বাড়তে থাকা প্রভাবকে একটি স্বাভাবিক, রাজনীতিমুক্ত উন্নয়ন-সহযোগিতা হিসাবে দেখানোয় বেইজিংয়ের নিজস্ব স্বার্থ আছে। এমন বাস্তবতায় ঢাকার উচিত তার সব অংশীদারকে চীনা ও ভারতীয় নির্বিশেষে একই মানদণ্ডে রাখা এবং সংবাদ-বিবৃতির বদলে কাজের মধ্য দিয়ে এ কথা বারবার প্রমাণ করা যে, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি মানে নতুন কোনো পৃষ্ঠপোষক খোঁজা নয়। একক কোনো বলয়ে ঢুকে পড়া নয় পূর্বে কিংবা পশ্চিমে। এটি শুধু বাংলাদেশের স্বার্থে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ‘নিউ ডকট্রিন’, যার নেতৃত্বে তারেক রহমান। পুশইন কিংবা সংখ্যালঘু ইস্যুর ভয়ে যে ডকট্রিন মোটেই বিচলিত নয়।

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী : স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেস-এর সহকারী অধ্যাপক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক