একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থা খাপ খাইয়ে নেওয়া। সরকার পরিবর্তন মানেই সব ধরনের ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন ধরনের নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। অতীতের বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক উত্তরণের সময় প্রকাশ্যে বিরোধিতার চেয়ে গোপন ষড়যন্ত্র, অভ্যন্তরীণ অনুপ্রবেশ, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থেকে নাশকতা এবং বিদেশি স্বার্থের প্রভাব অনেক সময় বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এমন সময়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানা ধরনের উদ্বেগ ও আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে যে, পূর্ববর্তী ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তি হয়তো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখনো অবস্থান করছেন অথবা পরিস্থিতি অনুকূল মনে করে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। একইভাবে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে বিভিন্ন পক্ষের অনুপ্রবেশের আশঙ্কাও জনপরিসরে আলোচিত হয়। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই গোয়েন্দা তথ্য, আইনগত প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত; তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও রাষ্ট্র পরিচালনার বিচক্ষণতার পরিচয় নয়।
এ প্রেক্ষাপটে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের একটি সতর্কবার্তা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনি ঢাকার বাইরে রাত্রিযাপন করবেন না। বিরোধী দল আপনার শত্রু নয়, আপনি যাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত তারাই আপনার শত্রু। বিরোধী দলের কথা শুনলে আপনি লাভবান হবেন। আপনার বাবা এবং মায়ের মতো ইতিহাস হয়ে থাকবেন।’ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে এ কথার সঙ্গে সবাই একমত হবেন এমন নয়, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি নিরাপত্তা-দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, অনেক রাষ্ট্রনায়ক বহিরাগত আক্রমণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা নিজের আশপাশের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন।
বাংলা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে-‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এর অর্থ হলো, যে হুমকি বাইরে থেকে দৃশ্যমান, তার চেয়ে কখনো কখনো ভেতরের হুমকি অনেক বেশি জটিল ও বিপজ্জনক। বিশ্বের বহু আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা হামলার ঘটনায় এ বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে নিহত হন। সে ঘটনার পেছনে সামরিক বিদ্রোহ, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার নানা দিক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ জিয়াউল হক ১৯৮৮ সালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন; সেই ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে আজও নানা বিতর্ক ও অনুসন্ধান রয়েছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো ২০০৭ সালে নির্বাচনি সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, যদিও তিনি ছিলেন কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। যা প্রমাণ করে যে, সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তাবলয়ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকির কাছে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ১৯৮১ সালে সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে নিজ দেশের সেনাসদস্যদের হামলায় নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ড আজও নিরাপত্তাব্যবস্থার ইতিহাসে একটি বড় শিক্ষা হিসাবে বিবেচিত হয়।
এসব উদাহরণে দেখায় যে, রাষ্ট্রনায়কের নিরাপত্তা শুধু অস্ত্রধারী প্রহরী বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। এর মধ্যে রয়েছে কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা, হুমকি মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা যাচাই, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, ভ্রমণ পরিকল্পনা, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সার্বক্ষণিক সমন্বয়।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় একজন প্রধানমন্ত্রীকে শুধু প্রচলিত হামলার ঝুঁকি নয়, ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ, নাশকতা, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য তৎপরতার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থের কারণে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অভ্যন্তরীণ হুমকির ক্ষেত্রেও নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে থাকা নিরাপত্তা বলয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত স্টাফ, চালক, প্রযুক্তি সহায়তাকারী এবং সংশ্লিষ্ট সবার নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তা যাচাই একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। নিরাপত্তাব্যবস্থায় আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কারণ নিরাপত্তা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, যখন সবাই মনে করে কোনো ঝুঁকি নেই, তখনই অনেক সময় সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি, বিশেষ করে রাতযাপনের পরিকল্পনা, জনসমাবেশে অংশগ্রহণ, রুট নির্বাচন এবং সর্বসাধারণের কাছে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অনুসরণ করা উচিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিকল্পনা হওয়া উচিত ঝুঁকিভিত্তিক, গতিশীল এবং গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর। কোনো সফর বা কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরাপত্তা মূল্যায়নকে কখনোই দ্বিতীয় স্থানে রাখা উচিত নয়।
একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতীক। তার ওপর যে কোনো সফল হামলা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দলীয় বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।
এ বাস্তবতায় সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচিত দেশের ভেতর ও বাইরের সম্ভাব্য সব ধরনের হুমকি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা, নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়মিত পর্যালোচনা করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিরুদ্ধে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা। রাজনৈতিক মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বের নিরাপত্তা রক্ষা রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। ইতিহাসের করুণ পুনরাবৃত্তি এড়াতে প্রয়োজন পেশাদারত্ব, সতর্কতা, সমন্বিত গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক








