জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সমাপনী আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে দেশের সার্বিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও কৌশলগত উন্নয়নের এক সময়োপযোগী রূপরেখা প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে দেশের পানি নিরাপত্তা ও কৃষির টেকসই উন্নয়নে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের যে দৃঢ় অঙ্গীকার তিনি ব্যক্ত করেছেন, তা উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উদ্বেগের অবসান ঘটাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
বলা বাহুল্য, উত্তরবঙ্গের জন্য তিস্তা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এ নদী ওই অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জীবনরেখাও বটে। দীর্ঘদিন শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট, বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙন এবং বন্যার কারণে রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা শুধু এ অঞ্চলের উন্নয়ন নয়, বরং গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। আমরা মনে করি, পানি ব্যবস্থাপনার এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গ মরুময়তা থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনে এক বিশাল বিপ্লব ঘটবে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের যে উদ্যোগের কথা প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, তা বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহারের পথ সুগম করবে, যা দেশের সামগ্রিক নদী ও সেচ অবকাঠামোয় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুধু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এতে ফুটে উঠেছে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ভুল নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক খাতকে টেনে তুলতে সরকার ঘোষিত তিন ধাপের কৌশল-পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্বাসন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার শক্তিশালীকরণ এবং ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ১৩টি দেশের সঙ্গে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট এবং ৬০টিরও বেশি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের তথ্য প্রমাণ করে, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা লাঘব করতে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক হিসাব খোলায় টিআইএন-এর বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার আহ্বান বাজেটটিকে সত্যিকারের জনবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। তরুণদের মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করার যে রূপকল্প প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েছেন, তা দেশের বিশাল তরুণ সমাজকে আশাবাদী করে তোলে।
বক্তব্যে জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার যে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অতীতমুখী বাদানুবাদ পরিহার করে দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এই প্রত্যয় প্রশংসনীয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়ন এবং ন্যায্যতাভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে সরকার ও বিরোধী দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে-এটাই প্রত্যাশা।








