দেশের পুলিশ প্রশাসনে মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল পদ পুলিশ সুপার (এসপি)। একটি জেলার আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ নির্ভর করে এই পদের কর্মকর্তার ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসপি পদায়নকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে এক নজিরবিহীন ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা শুরু হয়েছে। একের পর এক কর্মকর্তার এসপি পদের প্রজ্ঞাপন জারি এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তা বাতিল বা স্থগিত করা হচ্ছে। যোগদানের পরপরই পুলিশ সদর দপ্তরে তলবের ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যথাযথ গোয়েন্দা তথ্যের তীব্র ঘাটতি, তদবির ও পালটা তদবিরের রাজনীতি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সমন্বয়হীনতার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এই হযবরল পরিস্থিতি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এবং এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এইচএম শাহাদাত হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বা প্রশাসনিক বিষয় বিবেচনা করে এ ধরনের প্রজ্ঞাপন বা আদেশ জারি করে থাকে। কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বা প্রশাসনিক কারণে একটু সময় নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এটি সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বিবেচনা ও সিদ্ধান্তের বিষয়। অনেক সময় আদেশ হওয়ার পর প্রশাসনিক বা কাঠামোবদ্ধ পুনর্বিন্যাসের কারণে পরবর্তীতে নতুন করে আবার যোগদানের নির্দেশনা বা পোস্টিং দেওয়া হয়ে থাকে।

পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মকর্তাকে পাঠানোর আগে তার একটি ‘ফিটলিস্ট’ বা যোগ্যতার তালিকা প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সাম্প্রতিক পদায়নগুলোর ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যের চেয়ে ‘তদবিরের জোর’ বেশি কাজ করেছে। কাগজ-কলমে পদায়ন করার পর যখন সাধারণ মানুষ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অন্ধকার অতীত বা মামলার তথ্য সামনে আসছে, তখন বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হচ্ছে দায়িত্বশীলদের। আবার সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে এসপি হিসাবে পদায়নের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, প্রজ্ঞাপন জারি আর বাতিলের কানামাছি খেলায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে যাচ্ছে।

‘আজ একজন এসপি যোগ দিচ্ছেন, কাল তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে’-এই আতঙ্কে অনেক কর্মকর্তাই মাঠে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এ কারণে জেলাগুলোতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রুটিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিলের ঘটনায় যেসব কর্মকর্তা ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ঝালকাঠির বদরুল আলম মোল্লা ও প্রত্যুষ কুমার মজুমদার, মৌলভীবাজারের রিয়াজুল ইসলাম, ফেনীর মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান, পঞ্চগড়ের মো. মিজানুর রহমান প্রমুখ। এদের মধ্যে বদরুল আলম মোল্লা ঝালকাঠির এসপি হিসাবে যোগদানের প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই পান পুলিশ সদর দপ্তরের ফোন। ফোন পাওয়ার ৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ছাড়তে হয়েছে ঝালকাঠি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

৫ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লাকে ঝালকাঠির নতুন এসপি হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন ৬ জুলাই দুই কোটিরও বেশি টাকা ঘুসের চুক্তি করে পোস্টিং নেওয়ার পর চুক্তি মোতাবেক সময়মতো টাকা পরিশোধ না করার কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এই কথোপকথন বদরুলের এসপি হিসাবে যোগদান বাধাগ্রস্ত করতে পারে আশঙ্কায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে ঝালকাঠিতে যোগদানের মৌখিক নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুততার সঙ্গে সিআইডি থেকে বিদায় নিয়ে ৭ জুলাই বিকালে তিনি ঝালকাঠিতে যোগ দেন। এর ২০ মিনিট পর পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন তাকে ফোন করে বলেন, ‘যোগদান ক্যানসেল করে ঢাকায় চলে আসো।’

এসপি বদরুল একদিকে সিআইডি থেকে বিদায় নিয়েছেন। অন্যদিকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েও তা বাতিল করেছেন। তাই এই মুহূর্তে তার কোনো কর্মস্থল নেই। নতুন কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি নেওয়া বা পরে তার কী করণীয় সে বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে বদরুল আলম মোল্লা বলেন, ‘এসপি হিসাবে পদায়নের ক্ষেত্রে আমি কোনো অনৈতিক কাজে জড়াইনি। কল রেকর্ডের কোথাও অর্থ লেনদেনের বিষয় উল্লেখ নেই। বিশেষ উদ্দেশ্যেই ক্যাপশনে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।’ তার দাবি, অডিওটি সম্পূর্ণ ‘বিকৃত, এডিটেড ও বিভ্রান্তিকর’। একটি দৈনিক পত্রিকার ঢাকা অফিসের এক সাংবাদিকের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কথোপকথনের অংশবিশেষ বিকৃত করে তাকে হেয় করার জন্য এটি ছড়ানো হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি যুগান্তরকে বলেন, ‘অযথাই বদরুলকে অপদস্ত করা হয়েছে। যদি কল রেকর্ডের কারণেই তাকে ঝালকাঠি থেকে চলে আসতে হয়, তাহলে তাকে যোগদান করতে দেওয়া হলো কেন? যোগদানের আগেই তো ওই কল রেকর্ড ফাঁস হয়েছিল।’

এর আগে ৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারকে ঝালকাঠি জেলার পুলিশ সুপার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রত্যুষ কুমার মজুমদার ঝালকাঠিতে যোগদানের উদ্দেশে সিআইডি থেকে বিদায় নিলেও পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় আর যোগদান করতে পারেননি। পরে প্রত্যুষ কুমার মজুমদারকে ফেনী জেলার পুলিশ সুপার পদে পদায়ন করা হয়।

৫ মে সারা দেশের ১২টি জেলায় এসপি রদবদল করা হয়েছিল। ওই প্রজ্ঞাপনে মো. রিয়াজুল ইসলামকে মৌলভীবাজারের নতুন এসপি হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যোগদানের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে যে, ‘আড়াই কোটি টাকার চুক্তিতে’ তিনি এই বদলিটি বাগিয়েছিলেন। এই বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে ১৫ মে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এক আদেশে তাকে দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তর করে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেন।

৫ মের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মাহবুব আলম খান ফেনীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু যোগদানের ৪ দিনের মাথায় ৯ মে আইজিপির আদেশে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ফেনীর এসপি হিসাবে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করার পরপরই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পায় যে, তার বিরুদ্ধে দুটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা রয়েছে। হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাকে জেলার মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে খোদ পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। তাছাড়া তার পদায়নের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। ফেনীর এসপির সঙ্গে একই দিনে পঞ্চগড়ের নবনিযুক্ত এসপি মো. মিজানুর রহমানকেও প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে ওএসডি করার আদেশ দেওয়া হয়। তাকে জেলা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে তলব করার নেপথ্যে মূল কারণ ছিল তার অতীতের সুনির্দিষ্ট দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিভাগীয় অসদাচরণের দায়ে শাস্তির তথ্য প্রকাশ পাওয়া। মিজানুর রহমানকে পঞ্চগড়ের এসপি হিসাবে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তার অতীত আমলনামা ফাঁস হয়ে যায়। জানা যায়, ২০২২ সালে সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে বিভাগীয় অসদাচরণ ও অনিয়মের দায়ে তার এক বছরের জন্য ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি’ স্থগিত করার মতো বড় শাস্তি হয়েছিল। পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী, বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত বা রেকর্ড খারাপ থাকা কর্মকর্তাদের সাধারণত জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে (এসপি) পদায়ন করা হয় না।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (গোপনীয়) কামরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এসপিসহ পুলিশের বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার নীতি অবলম্বন করা হয়। এরই অংশ হিসাবে প্রজ্ঞাপন জারির পর অভিযোগ উঠা কর্মকর্তাদের প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে।