ভোলার চরফ্যাশনে এইচএসসি পরীক্ষার একটি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা ভাঙচুর চালিয়েছেন। আজ শনিবার বেলা দেড়টার দিকে পরীক্ষা শেষে উপজেলার ফাতেমা-মতিন মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। কেন্দ্র–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়ায় এবং নকল করার সুযোগ না দেওয়ায় পরীক্ষার্থীরা এই হামলা ও ভাঙচুর চালান। এ সময় ৮-১০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে।

ফাতেমা-মতিন মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব মহিউদ্দিন বাচ্চু প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কেন্দ্রে কঠোরভাবে নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিচ্ছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন কমন না পড়ায় তারা নকলের দাবি তোলে। আমরা বাধা দিলে তারা পরিকল্পিতভাবে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষা শেষে এই তাণ্ডব চালায়। এতে কলেজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা বিষয়টি প্রশাসন ও বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

রুমানা আফরোজ, ইউএনও, চরফ্যাশন উপজেলাপরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হওয়ার জেরে কিছু ছাত্র এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা শিক্ষক, উপজেলার সব কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং স্টুডেন্টদের নিয়ে বসেছি। সবার সিদ্ধান্তে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কেন্দ্রসচিব জানান, কেন্দ্রে চরফ্যাশন সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আইসিটি পরীক্ষা চলছিল। আজ মোট ৯০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিতি ছিলেন ৮৮৪ জন। পরীক্ষা শুরু হলে পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এমসিকিউ (বহুনির্বাচনী প্রশ্ন) এবং লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কমন পড়েনি ও অত্যন্ত কঠিন হয়েছে। একপর্যায়ে পরীক্ষার্থীরা দেখাদেখি ও নকল করার দাবি জানালে দায়িত্বরত শিক্ষকেরা তাতে বাধা দেন। নকল করতে না দেওয়ায় পরীক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ শুরু করেন, শিক্ষকদের ট্রল করতে শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।

ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন একাধিক শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁরা জানান, বেলা একটায় পরীক্ষা শেষে কলেজের সামনে অবস্থান নেয় একদল শিক্ষার্থী। তাঁরা ফোন করে আরও কিছু মানুষ এনে জড়ো করেন। বেলা দেড়টার দিকে তাঁরা কলেজে হামলা চালান। একপর্যায়ে ৩০০-৩৫০ শিক্ষার্থী কলেজের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে তাঁরা পেছনের ফটক ভেঙে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করেন। হামলাকারীরা কলেজের মূল প্রশাসনিক ভবন, অধ্যক্ষের কক্ষ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর করেন। অফিস কক্ষের দুটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) ও আসবাব ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে উত্তরপত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন। তবে শিক্ষকদের বাধায় তা সম্ভব হয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে

হামলায় ইটপাটকেলের আঘাতে কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শিকদার হুমায়ুন কবির, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মিজানুর রহমান, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী ও পথচারীসহ ৮–১০ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ায় সবার পরিচয় জানা যায়নি। খবর পেয়ে পুলিশ এসে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ভোলা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের চরফ্যাশন সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, উত্তেজিত ছাত্র–জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাসের দুটি শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে।

ফাতেমা–মতিন মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে ভাঙচুরের খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ মোতায়ন করা হয়

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী জানান, চরফ্যাশন সরকারি কলেজ ও ফাতেমা–মতিন মহিলা কলেজের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। আগে দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা পরস্পরের কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা দিত। এবার চরফ্যাশন সরকারি কলেজের পরীক্ষার্থীরা ফাতেমা–মতিন মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছেন। আর ফাতেমা–মতিনের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে জনতাবাজার ডিগ্রি কলেজে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ফাতেমা–মতিন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা পরীক্ষার শুরু থেকেই পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করছেন। পরীক্ষার সময় কোনো শিক্ষার্থী সময় জানতে চাইলেও খাতা নিয়ে কিছু সময় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। আজ পরীক্ষা শেষে ক্ষুব্ধ কয়েকজন শিক্ষার্থী কলেজের জানালার গ্রিল ও কাচের জানালায় ইট ছুড়ে ভাঙচুর করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হওয়ার জেরে কিছু ছাত্র এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা শিক্ষক, উপজেলার সব কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং স্টুডেন্টদের নিয়ে বসেছি। সবার সিদ্ধান্তে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’