দেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে আগামী এক দশকে নতুন উচ্চতায় নিতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) তৈরি, কোল্ড চেইন অবকাঠামো সম্প্রসারণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানী বাড্ডার নিজস্ব কার্যালয়ে জাগো নিউজ আয়োজিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, আগামী ১০ বছরে দেশের কৃষি খাতের চেহারা বদলাতে হলে ৬৪টি জেলার প্রতিটিতে অন্তত ১০টি করে দক্ষ এসএমই গড়ে তুলতে হবে।
এসব উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্র্যান্ডিং, বিপণন ও আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মেধা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় উদ্যোক্তা নির্বাচন করা গেলে তারাই আগামী দিনে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের নেতৃত্ব দেবে বলে মত তাদের।
ইসমাইল খান শামীম
ইসমাইল খান শামীম বলেন, বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন আম ই-কমার্সের মাধ্যমে বাজারজাত হচ্ছে, যা দেশের কৃষি বিপণনে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। তাদের সংখ্যা বাড়ানো গেলে দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
আরও পড়ুন
পাহাড়ে বিদেশি আম চাষে নতুন সম্ভাবনা
বক্তারা বলেন, দেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণে কোল্ড স্টোরেজ ও রাইপেনিং চেম্বারের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে ব্যবহৃত বিশেষ প্যানেলসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দিলে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
দেশে বৈজ্ঞানিকভাবে ফল পাকানোর জন্য রাইপেনিং চেম্বারের ব্যবহার বাড়ানো ও এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। এতে ফল পাকানো নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর হবে এবং ক্ষতিকর পদ্ধতির ব্যবহারও কমে আসবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সোহল রানা
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পে কৃষিখাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোরও আহ্বান জানান বক্তারা। তাদের মতে, স্টোরেজ, প্রসেসিং ও প্যাকেজিং অবকাঠামো উন্নয়নে একটি বড় মেগা প্রকল্প গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়।
উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, কৃষি ও এসএমই খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও কঠিন শর্ত ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে প্রকৃত উদ্যোক্তারা সেই অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে বরাদ্দ থাকা বিপুল অর্থও অনেক ক্ষেত্রে বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তাদের দাবি, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহ পান।
আরও পড়ুন
অনলাইন আম ব্যবসায়ীদের লাভের গুড় খাচ্ছে ফেসবুক বিজ্ঞাপন
বক্তাদের অভিমত, সরকার, বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। এতে ফসলের অপচয় কমবে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং কৃষিভিত্তিক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ও কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী।
ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ







