অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম। তিনি আরও বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানই হবে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি।
আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক না কেন, সঠিক নেতৃত্ব, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ প্রশাসন এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে, মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে এবং প্রতিটি নাগরিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।’
অর্থমন্ত্রী বাজেট নিয়ে দীর্ঘ, প্রাণবন্ত ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁদের মতামত ও সুপারিশ জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন এবং বাজেটকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
তিনি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সরকার এসব মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট কেবল একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা।’
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল ‘৩ আর’—রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন। এই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তবে কৃষি, শিল্প, সেবা, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতা, সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ এবং জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘সরকার সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প সম্প্রসারণ, সৃজনশীল শিল্পের বিকাশ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’
উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার করের হার বাড়াবে না; বরং করের আওতা সম্প্রসারণ করবে।’
তিনি জানান, করনীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রস্তাবিত একক হারের ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ছোট মুদি দোকানগুলোকে রাখা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।’
তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হবে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় কমে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে, যা বর্তমানে ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে পূর্ববর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি নিম্ন পর্যায় থেকে মধ্যম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।’
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।’
ঋণনির্ভরতা কমাতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি এবং বন্ড, সম্পদ সিকিউরিটাইজেশন ও ইকুইটি ফাইনান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।’ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ-বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১৫ টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০ টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
একীভূত পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের আমানত সুরক্ষার বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি জানান, ব্যক্তিগত আমানতকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে। গুরুতর অসুস্থ রোগী, হজ সঞ্চয়কারী এবং ডিপিএস হিসাবধারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর সরকার ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮ (ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের সম্পদ লুটকারীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, একই সঙ্গে আমানতকারীদের সঞ্চয়ও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে।’ পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে সরকার একাধিক কর প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
এসবের মধ্যে রয়েছে—জিরো কুপন বন্ডের আয়ে কর অব্যাহতি, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কম করহার, অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার জনসাধারণের কাছে ছাড়লে অতিরিক্ত করছাড়, লভ্যাংশের ওপর কর কমানো এবং মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের ৫ লাখ টাকার সীমা তুলে দেওয়া।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে আরও মানসম্মত কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ খালি হাতে ফিরেছে—এমন সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন শর্ত থাকায় সরকার আগের কর্মসূচি থেকে স্বেচ্ছায় সরে এসেছে। তবে দেশের স্বার্থের অনুকূল নতুন কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে সরকার প্রস্তুত।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদন খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।
তিনি জানান, অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং সরকারকে নিয়ন্ত্রক নয়, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), রপ্তানিমুখী শিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, দ্বিতীয় ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্মাণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজেটে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান—এই ১০টি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার, বিনিয়োগের প্রতিফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত টেকসইয়ের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি স্বীকার করেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এসব মোকাবিলায় ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন জোরদার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হবে বলে তিনি জানান।








