ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে বরখাস্ত করে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মিখাইলো দ্রাপাতিকে নিয়োগ দিয়েছেন। রাজধানী কিয়েভে টানা ছয় দিনের বিক্ষোভের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে অপসারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ফেদোরভ এর আগে সিরস্কির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়েছিলেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার জেলেনস্কি বলেন—রাশিয়ার আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরক্ষা যুদ্ধকে ‘নতুনভাবে পুনর্গঠিত’ করতেই দ্রাপাতিকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি বলেন, ‘ইউক্রেনের শক্তিশালী ফ্রন্টলাইন অবস্থান ধরে রাখার জন্য আমি ওলেক্সান্দর সিরস্কি এবং আমাদের প্রতিটি যোদ্ধার প্রতি কৃতজ্ঞ। একই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার জন্য আমি মিখাইলো দ্রাপাতির প্রতিও কৃতজ্ঞ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা একটাই, শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় এবং ফ্রন্টলাইনে এমন পরিস্থিতি ও রাশিয়ার ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা, যা রাশিয়াকে শান্তির দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করবে।’ জেলেনস্কি সামরিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করা এবং সেনা সমাবেশ (মোবিলাইজেশন) ও ফ্রন্টলাইন ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।
যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত ফেদোরভকে গত সপ্তাহে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। পদচ্যুত হওয়ার আগে সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যে সিরস্কির সমালোচনা করে বলেছিলেন, জেনারেলটি তাঁর সংস্কার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করছেন এবং ইউক্রেন যদি রাশিয়ার আগ্রাসন প্রতিহত করতে চায়, তাহলে সিরস্কিকে অবশ্যই সরিয়ে দিতে হবে।
ফেদোরভ ড্রোন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ কৌশল এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে তাঁর অভিযোগ ছিল, তুলনামূলকভাবে ঐতিহ্যবাদী হিসেবে পরিচিত সিরস্কি তাঁর এসব উদ্যোগকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করেছেন। মঙ্গলবার জেলেনস্কি ফেদোরভের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাঁকে সরকারের এমন একটি ‘সম্মানজনক পদ’ গ্রহণের প্রস্তাব দেন, যা দেশের প্রযুক্তি খাতকে ঐক্যবদ্ধ করবে। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, ফেদোরভ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে, এই পরিবর্তন বিক্ষোভকারীদের শান্ত করতে পারবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। বিক্ষোভকারীরা জবাবদিহি এবং আরও কার্যকর সামরিক কৌশলের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অনেকেই ইউক্রেনীয় সেনাদের ক্রমবর্ধমান হতাহতের প্রেক্ষাপটে সিরস্কি ও জেলেনস্কির যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা করছেন।
ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ড্যানিয়েল বেল মঙ্গলবার জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউক্রেনে ১ হাজার ৩৯৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৭ হাজার ৯৭৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা তাঁদের মিশন নথিভুক্ত করেছে। তিনি বলেন, এই সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি এবং ‘২০২৪ সালে আমরা যে সংখ্যা নথিভুক্ত করেছিলাম, তার প্রায় দ্বিগুণ।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মস্কো ও কিয়েভ উভয়ই একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা জোরদার করেছে। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধে চলা শান্তি আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, কারণ ওয়াশিংটনের মনোযোগ এখন অনেকটাই ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দিকে সরে গেছে।
রাশিয়া নিয়মিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, এসব হামলা প্রতিহত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে ভুগছে ইউক্রেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনও রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা জোরদার করেছে। এসব হামলার মূল লক্ষ্য তেলের ডিপো। শনিবার ইউক্রেনের একাধিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ায় অন্তত আটজন গুদামকর্মী নিহত এবং আরও কয়েক ডজন আহত হন। একই সঙ্গে মস্কোর বাইরে একটি তেলের ডিপোতে আরেকটি হামলায় আগুন ধরে যায়।
নতুন সেনাপ্রধান মিখাইলো দ্রাপাতিকে একজন শৃঙ্খলাবদ্ধ ও অত্যন্ত দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি প্রশংসিত হন। পরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে। ২০২৪ সালে দ্রাপাতি এমন বাহিনীর নেতৃত্ব দেন, যারা জেলেনস্কির জন্মশহর ক্রিভিই রিহর দিকে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। একই সঙ্গে তারা খেরসন অঞ্চলের কিছু এলাকা থেকে রুশ বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। পরে তিনি এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগঠিত করেন, যা খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন আক্রমণ কার্যকরভাবে প্রতিহত করে।
এরপর ওই বছরের শেষ দিকে জেলেনস্কি তাঁকে স্থলবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে ২০২৫ সালে তিনি সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যখন রাশিয়ার এক হামলায় স্থলবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে কয়েকজন ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হন।








