ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস, স্মৃতি ও পরিচয়ের এক বিশাল ভাণ্ডার। কোনো কোনো খেলোয়াড় সেই আবেগের প্রতীক হয়ে ওঠেন। ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র তেমনই একজন—প্রতিভা, শিল্প, বিতর্ক, ইনজুরি এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের এক জটিল অথচ আকর্ষণীয় নাম। তাই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর মাঠে ফেরা কেবল একটি বদলি খেলোয়াড়ের মাঠে নামা নয়; এটি ছিল বিশ্ব ফুটবলের জন্য এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্ত।

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ব্রাজিল যখন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলে এগিয়ে, তখন ম্যাচের ৭৬ মিনিটে কার্লো আনচেলত্তি মাতেউস কুনিয়াকে তুলে নেইমারকে নামালেন । মুহূর্তটি যেন শুধু ব্রাজিলের বেঞ্চ নয়, পুরো স্টেডিয়ামকে নাড়া দিল। কুনিয়া হাসিমুখে নেইমারকে আলিঙ্গন করলেন; গ্যালারিতে গগণবিদারী ধ্বনি উঠল—‘নেইমার, নেইমার’। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর ৯৮১ দিনের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে ফিরে এলেন সেই ১০ নম্বর।

এই প্রত্যাবর্তনের আগে একটি ছোট ঘটনা অথচ গভীরভাবে নেইমারের ফেরার গল্পকে আরও মানবিক করে তোলে। ‘দৌড়াও, নিজেকে নিংড়ে দাও। এমনভাবে দৌড়াও, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ দিন।’ কথাটি নেইমার সিনিয়রের। গত বছর কিংস লিগ ফাইনালে সতীর্থদের উজ্জীবিত করতে বাবার এই কথাই বলেছিলেন নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিল-স্কটল্যান্ড ম্যাচের আগে নেইমার সিনিয়র সেই ভিডিও নিজের ইনস্টাগ্রামে আবার শেয়ার করেন। ঘটনাটি নিছক পারিবারিক স্মৃতি নয়; বরং একজন ফুটবলারের দীর্ঘ পুনর্বাসন, মানসিক যুদ্ধ এবং শেষবারের মতো সবটুকু দিয়ে ফিরে আসার সংকল্পের প্রতীক।

নেইমারের প্রত্যাবর্তন তাই শুধু ব্রাজিলের জন্য সুখবর নয়; এটি ফুটবলের মানবিক সৌন্দর্যেরও স্মারক। কারণ মাঠে একবার ফিরে আসা কখনো কখনো একটি গোলের চেয়েও বড়, একটি জয়ের চেয়েও গভীর। বাবার বলা সেই কথার মতোই, নেইমার যেন আবার দৌড়ালেন, নিজেকে নিংড়ে দিলেন, যেন এটাই জীবনের শেষ দিন। ফুটবলের ভাষায় একে বলা যায় ‘কামব্যাক’; মানুষের ভাষায় এর নাম—আশার পুনর্জন্ম। প্রিন্স ফিরেছেন—শুধু ব্রাজিলের জার্সিতে নয়, কোটি মানুষের হৃদয়ে।

নেইমারের জীবনে বাবা কেবল অভিভাবক নন; তিনি তাঁর ফুটবল-যাত্রার প্রথম দর্শক, উপদেষ্টা ও মানসিক আশ্রয়। সান্তোসের কিশোর নেইমার থেকে বার্সেলোনার বিশ্বতারকা, প্যারিসের আলোচিত নাম থেকে চোটে জর্জরিত ব্রাজিলিয়ান অধিনায়ক—প্রতিটি অধ্যায়ে পরিবার তাঁর পাশে ছিল। তাই ম্যাচের আগে বাবার সেই বার্তা যেন ছেলের প্রতি ব্যক্তিগত আহ্বানও ছিল: আরেকবার দৌড়াও, আরেকবার নিজেকে নিংড়ে দাও, আরেকবার প্রমাণ করো যে শরীর থামালেও স্বপ্নকে থামানো যায় না।

এই উক্তির শক্তি এখানেই যে, এটি শুধু নেইমারের জন্য নয়; প্রতিটি ফিরে আসতে চাওয়া মানুষের জন্য প্রযোজ্য। দীর্ঘ চোটের পর একজন খেলোয়াড় যখন আবার মাঠে নামে, তখন সে শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়ে না; নিজের ভয়, সন্দেহ, ব্যথা ও অতীতের সঙ্গে লড়াই করে। নেইমারের চোখের জল তাই ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ হলেও এর ভেতরে ছিল বহু বছরের চাপ, অপূর্ণতা, সমালোচনা ও প্রত্যাশার ভার। বাবার কথাগুলো যেন সেই ভারকে শক্তিতে বদলে দেওয়ার এক মানসিক মন্ত্র।

নেইমারের ফুটবল ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রাজিলের জার্সিতে ৭৯ গোল করে তিনি জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। এই সংখ্যা তাঁকে পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ডের ওপরে নিয়ে গেছে। কিন্তু এত বড় অর্জনের পরও তাঁর ক্যারিয়ারের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ—ইনজুরি। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পিঠে আঘাত, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গোড়ালির সমস্যা, ২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে এসিএল ও মেনিসকাস ইনজুরি, দীর্ঘ অস্ত্রোপচার ও পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে নেইমারের জাতীয় দলের পথ ছিল যন্ত্রণায় ভরা।

সেই কারণেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এই প্রত্যাবর্তন ছিল এক ধরনের নীরব জয়। তিনি মাঠে ছিলেন অল্প সময়; সবমিলিয়ে প্রায় ২০ মিনিট। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তিনি দেখিয়েছেন, তাঁর ভেতরের শিল্প এখনো নিভে যায়নি। বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পাস, কর্নার নেওয়া, সুযোগ তৈরি করা এবং গোলের দিকে শট—সবকিছুতেই ছিল পুরোনো নেইমারের ছাপ। শরীর হয়তো এখন আগের মতো ঝলমলে গতির নয়, কিন্তু খেলার বোধ, পাসের কল্পনা ও সৃজনশীলতা এখনো তাঁকে আলাদা করে।

বিশ্ব গণমাধ্যমও নেইমারের ফেরাকে শুধু নিছ ফুটবল ম্যাচের ঘুটনা হিসেবে দেখেনি। Reuters লিখেছে, ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের রঙে তাঁর ফেরা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে এখনো তাঁর প্রতীকী গুরুত্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে। NBC Miami জোর দিয়ে লিখেছে, ব্রাজিল ভালো খেললেও টুর্নামেন্টের পরবর্তী ধাপে নেইমারের বেঞ্চ থেকে প্রভাব রাখার সক্ষমতা বড় প্রশ্ন ও সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে। Sofascore তাঁর ছোট্ট ক্যামিওর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, অল্প সময়েও নেইমার ম্যাচে ছাপ রাখতে পারেন।

অন্যদিকে Guardian স্কটল্যান্ডের হতাশা ও ব্রাজিলের মানের পার্থক্য তুলে ধরে লিখেছে, আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল এখন ক্রমেই পরিণত দলের মতো এগোচ্ছে। খেলা শেষে নেইমার কেঁদেছেন, কিন্তু হেসেছে, আবেগতাড়িত হয়েছে ব্রাজিলের কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগী। নেইমার শুধু ব্রাজিলের খেলোয়াড় নন; তিনি বৈশ্বিক ফুটবল-সংস্কৃতির এক আবেগময় চরিত্র।

তবে এই ম্যাচে আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়েছে। ব্রাজিল এখন কেবল নেইমারনির্ভর দল নয়। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র জোড়া গোল করে দেখিয়েছেন, নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত। মাতেউস কুনিয়া গোল করেছেন, আক্রমণে গতি এনেছেন। অর্থাৎ নেইমার ফিরেছেন এমন এক ব্রাজিলে, যেখানে তাঁকে আর একা সবকিছু বহন করতে হবে না। বরং তাঁর কাজ হতে পারে অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও মানসিক শক্তি দিয়ে দলকে পরবর্তী ধাপে আরও অপ্রতিরোধ্য করা।

এই বাস্তবতাই নেইমারের প্রত্যাবর্তনকে আরও অর্থবহ করে। এক সময় ব্রাজিলের সব আশা যেন তাঁর কাঁধে এসে জমা হতো। তিনি গোল না করলে প্রশ্ন উঠত, ড্রিবল না করলে সমালোচনা হতো, হাসলে বলা হতো হালকা, কাঁদলে বলা হতো দুর্বল। অথচ ফুটবলারের শরীরও মানুষের শরীর; সেখানে ব্যথা থাকে, ভয় থাকে, অনিশ্চয়তা থাকে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর চোখের জল তাই দুর্বলতার নয়; সেটি ছিল দীর্ঘ যন্ত্রণা পেরিয়ে ফিরে আসা একজন মানুষের মুক্তির ভাষা।

কার্লো আনচেলত্তিও নেইমারের ফেরা নিয়ে একটি সূক্ষ্ম কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁকে হঠাৎ করে পুরো ম্যাচে খেলানো ঝুঁকিপূর্ণ, আবার তাঁকে বাইরে রাখাও ব্রাজিলের আক্রমণভাগ থেকে এক বিরল সৃজনশীলতার উৎস কমিয়ে দেয়। তাই স্কটল্যান্ড ম্যাচে শেষভাগে তাঁকে নামানো ছিল সতর্ক কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে নেইমার ম্যাচের আবহে ফিরলেন, দল তাঁকে আবার পেল, আর প্রতিপক্ষও বুঝল—ব্রাজিলের বেঞ্চেও এমন একজন আছেন, যিনি এক মুহূর্তে খেলার গতি বদলে দিতে পারেন।

বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে এই প্রত্যাবর্তনের আলাদা অর্থ আছে। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর ব্রাজিলের পতাকা উড়ে। অনেক শিশু-তরুণের প্রথম ফুটবল-নায়ক নেইমার। তাঁর গোলের পর রাত জেগে উল্লাস করা, তাঁর জার্সি পরা, তাঁর ড্রিবল দেখে ফুটবল ভালোবেসে ফেলা—এসব আমাদের স্মরণীয় স্মৃতির অংশ। তাই নেইমারের ফেরা বাংলাদেশের ব্রাজিল-সমর্থকদের কাছে গভীর আবেগের বিষয়।

আজকের সমাজে আমরা মানুষকে খুব দ্রুত বিচার করি—একটি ব্যর্থতা, একটি অসুস্থতা, একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বিতর্ক দিয়ে। নেইমারের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষকে শুধু শেষ ফলাফল দিয়ে নয়, ফিরে আসার শক্তি দিয়েও বিচার করতে হয়। ট্রফি না পেলেও সংগ্রাম অর্থহীন নয়। বরং বারবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহসই মানুষকে বড় করে তোলে।

নেইমারের প্রত্যাবর্তন তাই শুধু ব্রাজিলের জন্য সুখবর নয়; এটি ফুটবলের মানবিক সৌন্দর্যেরও স্মারক। কারণ মাঠে একবার ফিরে আসা কখনো কখনো একটি গোলের চেয়েও বড়, একটি জয়ের চেয়েও গভীর। বাবার বলা সেই কথার মতোই, নেইমার যেন আবার দৌড়ালেন, নিজেকে নিংড়ে দিলেন, যেন এটাই জীবনের শেষ দিন। ফুটবলের ভাষায় একে বলা যায় ‘কামব্যাক’; মানুষের ভাষায় এর নাম—আশার পুনর্জন্ম। প্রিন্স ফিরেছেন—শুধু ব্রাজিলের জার্সিতে নয়, কোটি মানুষের হৃদয়ে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

এইচআর/এএসএম