ঢাকা, ৯ জুলাই: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সংগঠিত হয়ে আন্দোলনকে গতি দিয়েছিলেন। সেই অধ্যায়ে শহীদ ও আহতদের ত্যাগ, এবং বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের শিক্ষার্থীদের সংগ্রামকে ঐতিহাসিকভাবে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গৃহীত রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি Private University Resistance Day সফলভাবে পালনের প্রস্তুতি গত বুধবার থেকে একাধিক সংগঠনের সমন্বয়ে শুরু হয়েছে। রাজধানীর একটি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ এবং Private University Alumni Association of Bangladesh (PUAAB)-এর প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে আগামী কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

বৈঠকে PUAAB-এর পক্ষে কনভেনার মোহাম্মদ আহসান চৌধুরী, যুগ্ম কনভেনার ফাহমিদুর রহমান ওনি ও প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা কর্মসূচির কাঠামো, সমন্বয় ও আগামী ১৮ জুলাইয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা হিসেবে তারা এটিকে দেখছেন।

আর্মি স্টেডিয়ামে ঐতিহাসিক মহামিলনের প্রস্তুতি

বৈঠকে জানানো হয়, আগামী ১৮ জুলাই ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বড় আকারের মহামিলনের মাধ্যমে Private University Resistance Day পালিত হবে। এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, এলামনাই ও ছাত্রনেতারা একত্রিত হয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি ক্যাম্পাসের অবদানকে স্মরণ ও সম্মাননা জানাবেন। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই মহামিলন বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

রাজনীতিবিদ ইশরাক হোসেন তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে উল্লেখ করেছেন, উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ দিতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আয়োজক কমিটির পরবর্তী বৈঠকে জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এক মঞ্চে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন

প্রথম আনুষ্ঠানিক সভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সমাজ, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, জাতীয় ছাত্রশক্তি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ PUSAB, PUAAB ও PUNAB-এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্র সংগঠন একই আলোচনায় বসে কর্মসূচি নিয়ে মত বিনিময় করা দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বৈঠকে উপস্থিত নেতারা জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকাকে পৃথকভাবে তুলে ধরার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের ক্যাম্পাস থেকেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নিলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দীর্ঘদিনের দাবি এবার রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মাধ্যমে বাস্তব রূপ পাচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গঠিত গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে লেখা হয়েছে। সেই সময় শিক্ষার্থীরা ন্যায্য দাবি আদায়ে রাস্তায় নামলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অনেক শিক্ষার্থী শহীদ হন, অনেকে আহত হন; তাঁদের ত্যাগকে ভুলে যাওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন আয়োজকরা।

PUAAB পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান, ত্যাগ ও ঐতিহাসিক ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছে। “এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিকে জীবন্ত রাখার একটি প্রচেষ্টা,” বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, Private University Resistance Day-এর মাধ্যমে আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা স্মরণ করা হবে, শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাই আন্দোলনের এই অধ্যায় তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে এই কর্মসূচিকে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণের একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তারা জানান।

পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা

প্রথম সভার পর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে কর্মসূচির বিস্তারিত চূড়ান্ত, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয় নিয়ে আরও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ১৮ জুলাইয়ের মহামিলনকে সামনে রেখে প্রচারণা ও সমন্বয় কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলামনাইদেরও আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন ঐতিহাসিক এই অনুষ্ঠানকে সফল করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাতে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাঁদের অংশগ্রহণ ও ত্যাগকে স্মরণীয় করে তোলার এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। আগামী ১৮ জুলাই ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য মহামিলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায় লেখা হবে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।