সাধারণ পোশাকে দাঁড়ানো সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) পলাশ তালুকদার। চিনতে না পেরে তাদের পুলিশ মনে করে দুটি ট্রাক এসে থামে সামনে। এ সময় একজন চালক গাড়ি থেকে নেমে এসে ইউএনওকে বললেন, ‘স্যার, সভাপতির গাড়ি’। ইউএনও সহকারী কমিশনারকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওনার কাছে যান।’ তখন সহকারী কমিশনারের কাছে গিয়ে এক হাজার টাকা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্যার, টাকাটা নেন।’ সহকারী কমিশনার বলে উঠলেন, এটি কীসের টাকা? তখন চালক বললেন, ‘গাড়িপ্রতি টাকা!’
সম্প্রতি এ ঘটনা ঘটে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ গেটের সামনে থাকা ভোলাগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কের ওপর স্থাপিত পুলিশ চেকপোস্টে। পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি নামে পুলিশ চেকপোস্ট হলেও বাস্তবে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম খানের একটি অঘোষিত ‘টোল প্লাজা’।
ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে লুটপাটের বালু ও পাথর পরিবহণে ব্যবহৃত লোডিং ট্রাকগুলোকে এখানে থামতে হয়। নিতে হয় ছাড়পত্র। অর্থের বিনিময়ে নিতে হয় বৈধতা। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ-সদস্য ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর। তারপরও থামেনি তাদের এ চেকপোস্টের চাঁদাবাজি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলে দৈনিক ৪০০-৫০০ ট্রাক দিয়ে অবৈধ বালু ও পাথর পরিবহণ করা হয়েছে। এখন তা কমে গেছে, দৈনিক দুই শতাধিক ট্রাক যায়। কার কতটি ট্রাক যায়, তা চেকপোস্টে পুলিশ হিসাব রাখে। এরপর পুলিশের কাছে বিভিন্নভাবে ট্রাকপ্রতি ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করে পৌঁছে দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে চেকপোস্টের সিসি ক্যামেরার বাইরে ব্র্যাক ব্যাংকের পেছনে গিয়েও পুলিশ চাঁদা নেয়। তবে এখন পুলিশ খুবই সতর্কতা অবলম্বন করে টাকা নেয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের ট্রাকের নম্বর আগেই পুলিশকে দিয়ে দিই। চেকপোস্টে তারা হিসাবে করে রাখে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, চেকপোস্টে উত্তোলিত এই টাকা থানার মুন্সীর কাছে থাকে। তা দিয়ে থানার বিভিন্ন খরচ মেটানো হয়।
বিগত ১৭ বছরে ‘আওয়ামী পরিবারের সন্তান’, ৫ আগস্টের পর জামায়াত, এখন বিএনপি পরিচয় দেওয়া ওসি শফিকুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই। ওসির বন্ধু ও ব্যাচমেট এসআই নুর মিয়াকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য’। ওসির বিভিন্ন অনিয়ম ও অপকর্মের অভিযোগ এসেছে যুগান্তরের কাছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানীগঞ্জ থেকে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য ও গরুর চোরাচালানভেদে ১ হাজার থেকে ২ লাখ, শাহ আরফিনের লুট করা পাথরবাহী ট্রাক্টরপ্রতি ৫০০ থেকে ৬ হাজার, কালাইরাগে অবৈধ বালুবাহী ট্রাক্টরপ্রতি ১০০০, রুস্তমপুর পিলখানায় লিস্টার মেশিনপ্রতি ৫ হাজার, উৎমার পাথরবাহী ট্রাক্টরপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার, সাদাপাথর ও শাহ আরফিনের পাথর ভাঙার মেশিনপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার, ধলাই সেতু ও পুলিশ ফাঁড়ির পেছন থেকে বালু উত্তোলনের নৌকাপ্রতি ৫০০ এবং ট্রলিপ্রতি এক হাজার টাকা করে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ওসি ও কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। মাঝেমধ্যে জব্দ ট্রাক ও ট্রাক্টর ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, সাদাপাথর, শাহ আরফিন, কলাবাড়ী ও কালাইরাগের বিভিন্ন মামলার আসামিদের কাছ থেকে অর্থ বাণিজ্য ও ফাঁসানোর অভিযোগ রয়েছে ওসির বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ওসি শফিকুলের হয়ে অতীতে এসআই সিকান্দার, এসআই কামরুল আলম এবং এসআই আমিরুল ইসলাম এসব চাঁদার টাকা সংগ্রহ করলেও এখন দায়িত্বে এসআই নুর মিয়া।
গেল ২০ জুন উপজেলার টুকেরবাজার পয়েন্টে ভারতীয় মদ ও একটি মেট্রোপ্লাস মোটরসাইকেলসহ একজনকে পুলিশে দেয় জনতা। তবে টাকার বিনিময়ে জব্দ মোটরসাইকেলটি এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে পুরোনো ভাঙা আরেকটি মোটরসাইকেল মামলার আলামত হিসাবে জব্দ দেখানো হয়।
আব্দুল করিম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ৪ এপ্রিল ভাঙা পাথর লোড করার সময় আমার ট্রাক ধরে নিয়ে যান এসআই আমিরুল ইসলাম। গাড়ির মামলার চার্জশিটের জন্য খরচের কথা বলে ওসি শফিকুল আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন। এর কিছুদিন পর ওসি হজে চলে যান। এরপর ভোলাগঞ্জ ফাঁড়িতে ইনচার্জ হয়ে আসেন এসআই নুর মিয়া। তিনি চার্জশিটের জন্য ২০ হাজার টাকা চাইলে আমি ১৫ হাজার টাকা দিয়েছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেন, ওসি শফিকুল টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। কালা মিয়া নামের এক আসামিকে ধরতে না পেরে তার মা ৭০ বছরের রূপজান বিবিকে ধরে এনে হাজতে বন্দি এবং মামলার আসামিও করেছেন।
বরমসিদ্দিপুর গ্রামের সামছুদ্দিনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, চার মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হেলাল। তাকে ওসি চোরাচালানের লাইনম্যান বানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক চোরাকারবারি বলেন, ২৬ জুন রাতে দুটি নৌকা থেকে কাভার্ডভ্যানে লোড করার সময় পুলিশ ও ডিবি মিলে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ এবং একজনকে আটক করে। কিন্তু চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের কাউকেই আসামি করেনি। উলটো এসব পণ্যের মালিক বিছানাকান্দির রহমতের সঙ্গে বসে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রফাদফা করেছেন। চোরাচালানের যত মামলা হয়, সেসবের প্রকৃত অপরাধীদের তিনি কৌশলে বাদ দিয়ে দেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই নুর মিয়া বলেন, ‘এসব অপ্রয়োজনীয় কথা কে বলেছে আপনাকে? আপনি দেখেছেন কি? তথ্য থাকলে আপনি লিখেন।’ অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘চেকপোস্টে নিয়মিত পুলিশ ডিউটি করে। সেখানে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে প্রশাসন সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানা নেই।’
সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, আপনার কাছে এ ধরনের তথ্যপ্রমাণ থাকলে আমাদের দিতে পারেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








