মিরপুরের পল্লবীর আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। ওই ঘটনার কয়েকদিন আগে, ১৩ মে সন্ধ্যায় ওই শিশুটির বাসার পাশের বাসা থেকে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছরের শিশু ইব্রাহিম। এখনো তার কোনো সন্ধান মেলেনি। বাবা ঝালমুড়ি বিক্রেতা জসিম তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে মিরপুর ১১ নম্বরের বি-ব্লকের একটি বাড়িতে এক রুম ভাড়া নিয়ে থাকেন। ইব্রাহিমকে সিসিটিভি ফুটেজে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে বাসায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। তার পেছনেই ঢোকেন বাড়ির মালিক মো. ওমর শরীফ। পরে শিশুটির চিৎকার শোনা গেলেও তাকে আর দেখা যায়নি। বাড়ির ভেতরে তার স্যান্ডেল পাওয়া যায়। ঘটনার পরদিন জিডি করা হলেও পুলিশ চার দিন পর ঘটনাস্থলে যায়। এ ঘটনায় ২ জুন অজ্ঞাত আসামি করে মামলা নেয় পুলিশ। পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি এখন ডিবি তদন্ত করছে।
এদিকে ইব্রাহিম নিখোঁজ হওয়ার চার দিন আগে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে আট বছরের শিশু আলী হোসেনও নিখোঁজ হয়। ৯ মে বিকালে খেলতে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরদিন থানায় জিডি করেন তার বাবা। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির সন্ধানে কাজ চলছে। দারুস সালাম থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইমাম মেহেদী জানান, সব বিষয় মাথায় রেখেই শিশুটির সন্ধানে কাজ করছে পুলিশ।
ইব্রাহিম বা আলী নয়, এভাবে প্রতিদিন নিখোঁজ হচ্ছে বহু শিশু। তবে শিশু উদ্ধারে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেই কোনো সমন্বিত উদ্যোগ। প্রতিদিন ঢাকাসহ সারা দেশে কত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে? এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজির (মিডিয়া) কাছে তথ্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসাবে বিবেচনা করেন তদন্তকারীরা। এই সময়ের মধ্যে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুকে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে। নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দেশে চালু হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কতা ব্যবস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন অ্যালার্ট)। চলতি বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সিআইডির সমন্বয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সিআইডি সমন্বয় করছে না বলে অভিযোগ মুন অ্যালার্টের। এতে শিশু উদ্ধারে একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
কী এই মুন অ্যালার্ট : মুন অ্যালার্ট মূলত অ্যাম্বার অ্যালার্ট মডেলে তৈরি একটি জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা। কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হলে তার ছবি, পরিচয় ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মেটার সহযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার ১৬০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের কাছেও সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
মুনতাহা থেকে ‘মুন’ : সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালে সিলেটে পাঁচ বছর বয়সি শিশু মুনতাহা নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর তার লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর অ্যাম্বার অ্যালার্টের মতো একটি জাতীয় সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর দাবিতে অনলাইন পিটিশন শুরু হয়। এক লাখের বেশি মানুষ এতে সমর্থন জানান। পরে ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম’ আন্তর্জাতিক সংস্থা, ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেই উদ্যোগে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি সিআইডির সহযোগিতায় ঢাকায় পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়। ২৫ মে আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবসে জাতীয় পর্যায়ে মুন অ্যালার্টের আনুষ্ঠানিক সম্প্রসারণ ঘটে।
‘গোল্ডেন টাইম’ হারানোর অভিযোগ : মুন অ্যালার্ট সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক পরিবার এখনো ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষার প্রয়োজন মনে করে। আবার থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশও আগে নিজেরা খোঁজাখুঁজি করার পরামর্শ দেয়। শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যায়। তাদের মতে, নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই ‘গোল্ডেন টাইম’। এ সময় দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা গেলে শিশুকে নিরাপদে উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
কীভাবে কাজ করে : কোনো শিশু নিখোঁজ হলে অভিভাবক বা স্বজনরা টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯, মুন অ্যালার্টের ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য জানাতে পারেন। এরপর শিশুর ছবি, পরিচয়, সর্বশেষ অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে সংস্থাটি। প্রয়োজন হলে মুন অ্যালার্ট জারি করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মুন অ্যালার্ট চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৩২১৯ নম্বরে মোট ৭ হাজার ৯৮৯টি কল এসেছে। এর মধ্যে নিখোঁজ শিশুসংক্রান্ত কেস ২২৮টি। এসব কেসের মধ্যে ১৮০টি শিশুকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। ৪৮ শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া ৫০টি ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে মুন অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। এসব অ্যালার্টের মাধ্যমে ২৮ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশি সহায়তা ছাড়া সীমাবদ্ধতা রয়েছে : জিরো মিসিং চিলড্রেন প্ল্যাটফর্মের প্রধান নির্বাহী সাদাত রহমান বলেন, মুন অ্যালার্ট মূলত সচেতনতা তৈরি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। তবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, কিন্তু উদ্ধার করতে পারি না। উদ্ধার ও তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এজন্য নিখোঁজ শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট প্রয়োজন। দেশে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের জন্য আলাদা কোনো জাতীয় ডেটাবেস, বিশেষ বাজেট কিংবা বিশেষায়িত ইউনিট নেই। ফলে অনেক পরিবার বছরের পর বছর সন্তান হারানোর বেদনা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
সিআইডির সঙ্গে দূরত্ব কেন : মুন অ্যালার্টের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, শুরুতে সিআইডির সহযোগিতা থাকলেও বর্তমানে সেই সমন্বয় নেই। প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং নীতিগত জটিলতার কারণে যৌথ উদ্যোগটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। বিশেষ করে সিআইডির সাবেক প্রধান মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের বদলি হওয়ার পর সিআইডি আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতায় সরে যায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
তবে সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম বিভাগের পুলিশ সুপার বদির আলম মোল্লা বলেন, মুন অ্যালার্ট আগে সিআইডির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত ছিল। বর্তমানে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়। তাদের কার্যক্রম এবং সরকারি কার্যপদ্ধতির মধ্যে কিছু সমন্বয়গত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শিশু নিখোঁজ কেন হয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। অনেক শিশু অভিমান, পারিবারিক চাপ বা পরীক্ষার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে থাকে অপহরণ, মানব পাচার, যৌন শোষণ, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা মুক্তিপণের উদ্দেশ্য। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো-অনেক শিশু পাচারচক্রের হাতে পড়ে দেশের বাইরে চলে যায় অথবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুদের উদ্ধারের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও পদক্ষেপে বিলম্ব হয়। তিনি বলেন, কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, যোগাযোগ নম্বর প্রকাশ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারিতে আনা জরুরি। শিশু উদ্ধারে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার এবং অপরাধ দমন আরও কার্যকর হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে ‘মুন অ্যালার্ট’-এর মতো কার্যকর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এটি একটি মানবিক সেবা, তাই এ বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। পুলিশ সদর দপ্তরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানান তিনি। তার মতে, আলাদা উইং গঠনই একমাত্র সমাধান নয়; বরং সমন্বিতভাবে কার্যকর কাজ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।








