নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় কিলিং মিশন বাস্তবায়ন, কোটি টাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি আর পাড়া-মহল্লায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। অনেকে আবার ভাড়াটে খুনি হিসাবেও কাজ করত। সে সময় পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল ঢাকার কয়েকটি এলাকা। অপরাধজগতের সেই আধিপত্য গুঁড়িয়ে দিতে ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা ঘোষণা করে। তাদের ধরতে লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকার। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায়ও ওঠে অনেকের নাম।

ওই তালিকা প্রকাশের পরই আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেউ বিদেশে পাড়ি জমান, কেউবা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। আত্মগোপনেও চলে যান কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তবে তাদের কার্যক্রম থেমে থাকেনি। দুই যুগের বেশি সময় পরও তাদের উত্তরসূরিদের নিয়ন্ত্রেণেই আছে ঢাকার আন্ডারওয়াল্ড। ফলে এখনো তারাই আলোচনায়। অনেক এলাকায় তাদের ছত্রছায়ায়, আবার কোথাও কোথাও তাদের নাম ভাঙিয়ে চলছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীদের তাদের নামে রিপোর্ট করতে উৎসাহিত করেন। কারণ আলোচনা হলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং এতে তাদের চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যায় বলে আলোচনা আছে। সম্প্রতি ওই তালিকায় দুই নম্বরে নাম থাকা খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন গুলিতে নিহত হওয়ার পর ফের আলোচনায় সেই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী। এ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে তালিকার ১৬ নম্বরে নাম থাকা পিচ্চি হেলালের বিরুদ্ধে। এর মধ্য দিয়ে আবার ফিরেছে সেই পুরোনো আতঙ্ক। সময়ের ব্যবধানে ঢাকার অপরাধ জগতের খোলনলচে বদলে গেছে। কিন্তু সেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের উত্তরসূরিরা এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আন্তঃকোন্দলে একের পর এক ঘটছে খুনের ঘটনা। তাদের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেকটা অসহায়-এমনটাই মনে করছেন সাধারণ জনগণ।

সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই কারামুক্ত হয়েছেন। তাদের কেউ দেশে, আবার কেউ বিদেশে সক্রিয় রয়েছেন। দেশে অবস্থানকারীরা আন্তঃকোন্দলে একের পর এক খুন হচ্ছেন। তালিকায় থাকা ২৩ সন্ত্রাসীদের মধ্যে বিভিন্ন দেশে পলাতক আছে ১১ জন, জামিনে মুক্ত ৪ জন। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এবং স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। এর বাইরে এখনো কারাগারে আছে ৩ জন। দায়িত্বশীলরা বলছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তীতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যারা দেশ ছেড়েছেন তাদের বিষয়ে তেমন তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। কিন্তু যারা জামিনে তারা নজরদারিতে আছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওই তালিকার দুই-চারজন দেশে আছে। আমরা চেষ্টা করি তাদের খোঁজখবর রাখার জন্য। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে অবশ্যই তো তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কেউ যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, তবে সেটা তার ও দেশের জন্য মঙ্গল’। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়া বা তাদের জামিন পাওয়া রাষ্ট্রের হঠকারী সিদ্ধান্ত। বিচারকার্য শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটি করা হয়েছে, যার ফলে সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা এখন হুমকির সম্মুখীন। এর জন্য যারা দায়ী, তাদেরও বিচার হওয়া উচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব তাদের পুনরায় গ্রেফতারের পর বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই আটকে রাখা।

জানা গেছে, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে। ঢাকার মোস্ট ওয়ান্টেড ওই সন্ত্রাসীরা হলো-কালা জাহাঙ্গীর, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন, সোহেল ওরফে ফ্রিডম সোহেল, খন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয়, হারিস আহমেদ ওরফে হারেস, খোরশেদ আহমেদ ওরফে রাসু, ইমাম হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, জব্বার মুন্না, আব্বাস ওরফে কিলার আব্বাস, কামাল পাশা ওরফে পাশা, আরমান, মোল্লা মাসুদ, মশিউর রহমান কচি, ত্রিমতি সুব্রত বাইন, ইমামুল হোসেন ওরফে হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, মোহাম্মদ হান্নান ওরফে পিচ্চি হান্নান, এম আলাউদ্দিন, লিয়াকত, কামরুল হাসান ওরফে হান্নান, শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীম, জাফর আহমেদ ওরফে মানিক ও আমিনুর রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর। সূত্র বলছে, ওই সময় অপরাধীরা এতটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যে, থানা-পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল ঢাকার রমনা, নিউমার্কেট, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকা। তালিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীদের কোণঠাসা করা এবং পুলিশের সরাসরি অ্যাকশনে যাওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া।

২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কে কোথায় : তালিকায় এক নম্বরে থাকা কালা জাহাঙ্গীরের বাড়ি বগুড়া, থাকতেন রাজধানীর মিরপুর কাফরুল এলাকায়। স্কুল শিক্ষিকা মায়ের অত্যন্ত মেধাবী সন্তান ছিলেন তিনি। তবে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে নাম লেখান খুনির খাতায়। কালা জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা ‘ভাড়াটে খুনি’ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ২০০৩ সালের পর কালা জাহাঙ্গীর হঠাৎ ‘উধাও’ হয়ে যান। তালিকায় দুই নম্বরে রয়েছে নাঈম আহমেদ টিটনের নাম। তিনি মূলত ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। ২০ বছর কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান টিটন। গত ২৮ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে খুন হন তিনি।

শীর্ষ সন্ত্রাসী ফ্রিডম সোহেল দুই দশকেরও বেশি সময় বন্দি ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। ফ্রিডম সোহেলের বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্র মামলাসহ ১১টি মামলা ছিল।

তালিকায় তিন নম্বরে নাম থাকা কুখ্যাত ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের অন্যতম প্রধান খন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয় কিডনি জটিলতায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল কুয়ালালামপুরের তালাবদ্ধ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। নব্বই দশকের আলোচিত মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিস আহমেদ ওরফে হারেস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলাচল করছেন বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের আপন ভাই আলোচিত হারেস। আজিজ আহমেদের প্রভাবেই ২০১৯ সালে হারিসের সাজা মওকুফ হয়। পরে জানা যায়, রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্ত হন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। খোরশেদ আহমেদ ওরফে রাসু দুই দশক কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালে নতুন প্রেক্ষাপটে জামিনে মুক্তি হয়ে এখন পর্যন্ত লাপাত্তা। রাজধানীর মিরপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. আব্বাস আলী অপরাধজগতে কিলার আব্বাস নামে পরিচিত। দুই দশকেরও বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন দেশেই রয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ২৪ বছর কারাবন্দি ছিলেন। তিনিও ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্ত হন। যতদূর জানা গেছে, তিনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী কামাল পাশা ২০১৬ সালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। এছাড়া কুখ্যাত সেভেন স্টার গ্রুপের প্রধান ত্রিমতি সুব্রত বাইন এখন কারাগারে বন্দি। দুই দশকেরও বেশি সময় ভারত ও নেপালে আত্মগোপন এবং কারাভোগের পর সেখান থেকে জামিন পেয়ে বাংলাদেশে ফেরেন। ২০২৫ সালে ২৭ মে কুষ্টিয়া থেকে তাকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী। এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরেক সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদকেও গ্রেফতার করা হয়। জাফর আহমেদ মানিক যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন। পলাতক আছেন আরেক সন্ত্রাসী মশিউর রহমান কচি। শীর্ষ সন্ত্রাসী শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীম, জব্বার মুন্না ও ইমাম হোসেন ফ্রিডম ইমাম ভারতে পলাতক আছেন। প্রকাশ বিশ্বাস এবং আমিনুর রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। কামরুল হাসান ইউরোপের কোনো একটি দেশে আছেন।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন-এর পর শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকত রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সাদা পোশাকধারী পুলিশ তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। ২০০২ সালে রামপুরায় গণপিটুনিতে মারা যান শীর্ষ সন্ত্রাসী এম আলাউদ্দিন। ২০০৪ সালের ২৬ জুন র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন পিচ্চি হান্নান। তিনি ছিলেন রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও আশপাশের এলাকার অপরাধ জগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক।