ফুটবল ঈশ্বরের নির্মম এক পরিহাসের নাম শোধবোধ। আর সেই রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের মঞ্চ এবার প্রস্তুত হিউস্টনে। সোমবারের নকআউটের মহারণ কেবল বিশ্বকাপে টিকে থাকার লড়াই নয়, কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলের জন্য এটি এক রক্তাক্ত অতীতকে কবর দেওয়ার রাত। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে, টোকিওর সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এই ছন্নছাড়া দলটাকে কতটা ভয়ঙ্কর করে তুলেছেন ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড।
যাওয়া যাক ২০২৫ সালের সেই অভিশপ্ত অক্টোবরের প্রীতি ম্যাচে। ম্যাচের প্রথমার্ধেই জাপানকে কোণঠাসা করে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সাম্বায় তখন উৎসবের আমেজ। কিন্তু কে জানত, দ্বিতীয়ার্ধে অপেক্ষা করছে এক নারকীয় সুনামি! মাত্র ২০ মিনিটের এক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ব্রাজিলের ডিফেন্স। একের পর এক কামড়ে টানা তিন গোল করে ম্যাচ ছিনিয়ে নেয় ব্লু সামুরাইরা। ফুটবল ইতিহাসের ১৪বারের দেখায় প্রথমবারের মতো ব্রাজিলকে বিষাক্ত হারের স্বাদ দেয় জাপান।
সেই রাতটি ছিল আনচেলত্তির জন্য এক জ্বলন্ত অগ্নিপরীক্ষা। রিয়াল মাদ্রিদের রাজকীয় আরাম ছেড়ে যখন তিনি সেলেসাওদের দায়িত্ব নেন, দলটির অবস্থা ছিল চূর্ণ-বিচূর্ণ। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য পারফরম্যান্স করে পঞ্চম স্থানে ছিল তারা, ডাগআউটে বদলেছিল চার-চারজন কোচ। মাত্র এক বছরের মধ্যে এই মৃতপ্রায় দলটাকে জাগিয়ে তোলার এক অসম্ভব মিশন ছিল তাঁর কাঁধে।
বিশ্বকাপের দল গোছানোর আগে আনচেলত্তি সময় পেয়েছিলেন মাত্র পাঁচটি আন্তর্জাতিক বিরতি। এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপক্ষের গোলকধাঁধায় ফেলে তিনি পরখ করছিলেন তাঁর যোদ্ধাদের। এশিয়া সফরের শুরুটা দুর্দান্ত হয়েছিল, সিউলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা। এরপর টোকিওতে জাপানের বিপক্ষেও প্রথম ৩০ মিনিটেই জোড়া গোলে লিড। কিন্তু ম্যাচের পরের অংশে জাপান যে নরক তৈরি করেছিল, সেই তিক্ত স্মৃতি নিয়েই দেশে ফিরতে হয়েছিল ব্রাজিলকে।
তবে হিউস্টনের রাতটি হবে সম্পূর্ণ আলাদা, অনেক বেশি রক্তাক্ত।
সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে নেদারল্যান্ডসের পেছনে থেকে কোনোমতে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউটে এসেছে জাপান। তাদের কোচ হাজিমে মোরিয়াসু যেন আগে থেকেই টের পাচ্ছেন বাতাসের বারুদ। তিনি বলেন, “হয়তো তারা এবার আরও বেশি হিংস্র থাকবে। আমরা এমন এক ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যারা জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ছটফট করছে। আমি এই যুদ্ধের অপেক্ষায় আছি।”
তবে গত বছরের সেই অপরাজেয় জাপান দলটির অহংকার এবার চোটের আঘাতে জর্জরিত। ইনজুরির করাল গ্রাসে মাঠের বাইরে দলের প্রাণভোমরা ও অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো, উইঙ্গার কাওরু মিতোমা, তাকেফুসা কুবো এবং আগের ম্যাচে ব্রাজিলের বুক চিরে গোল করা ফরোয়ার্ড তাকুমি মিনামিনো।
বিপরীতে, ব্রাজিল দল এখন এক পুনর্জন্ম নেওয়া রণতরী। টোকিওতে যে ডিফেন্স জাপানের সামনে ভেঙে পড়েছিল, তাদের একজনকে ও বর্তমান বিশ্বকাপে রাখেননি আনচেলত্তি। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও, পরের ম্যাচগুলোয় রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে সেলেসাওরা। টানা দুই জয়ে ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গোলক্ষুধায় মত্ত হয়ে ইতোমধ্যে প্রতিপক্ষের জালে চারবার বল পাঠিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় ত্রাস হিসেবে যোগ দিয়েছেন নেইমার, দীর্ঘ তিন বছরের চোটের নরকযন্ত্রণা সহ্য করে যিনি ফিরেছেন নিজের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে।
স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আনচেলত্তির কণ্ঠে ঝরেছিল এক সতর্ক বার্তা, “আমরা নিখুঁত নই, তবে প্রথম ম্যাচের পর থেকে দল যেভাবে খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে, তাতে আমি খুশি। এখন নকআউট পর্ব, এখানে কেবল কৌশল নয়, আমাদের মনের ভেতরের আসল হিংস্রতা আর দৃঢ়তা দেখাতে হবে।”
এই লড়াইয়ের নেপথ্যে বইছে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন স্রোত। জাপানি ফুটবলের মেরুদণ্ড গড়ে উঠেছিল যাঁর হাত ধরে, তিনি ব্রাজিলেরই কিংবদন্তি জিকো। ফ্লামেঙ্গো আর ব্রাজিলের জার্সি গায়ে কাঁপানোর পর, ১৯৯১ সালে অবসর ভেঙে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন জাপানের কাশিমা অ্যান্টলার্সে। জাপানের পেশাদার ফুটবলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন থেকে শুরু করে ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দলটির কোচের দায়িত্বও পালন করেন জিকো। তাঁর অধীনেই ২০০৪ সালে এশিয়ান কাপ জেতে জাপান। কিন্তু নিয়তির নির্মম খেলা দেখুন, ২০০৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এই জিকোর জাপানকেই ৪-১ গোলে চূর্ণ করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দিয়েছিল ব্রাজিল।
ইতিহাসের চাকা ঘুরে আবার একবিন্দুতে এসে মিলেছে। একদিকে জাপানের সামনে সুযোগ ব্রাজিলের দর্প চূর্ণ করে পুরোনো ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার, অন্যদিকে আনচেলত্তির ব্রাজিলের সামনে সুযোগ টোকিওর সেই অপমানের শোধ নিয়ে বিশ্বজয়ের পথে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দেওয়ার। হিউস্টনের পিচে এখন কেবলই বারুদের গন্ধ, অপেক্ষা শুধু রক্তক্ষয়ী এক মহাকাব্যের।








