রাতের মেঘমুক্ত আকাশের দিকে তাকালে আমাদের মনে এক অদ্ভুত বিস্ময় জাগে। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রদের দেখে আমাদের মন ভালো হয়, বিষণ্নতায় আমরা কেঁদে উঠি, কিংবা মহাবিশ্বের বিশালতা দেখে স্তব্ধ হয়ে যাই। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই যে আমাদের ভেতরে অনুভূতি তৈরি হচ্ছে; এই আনন্দ, বেদনা বা বিস্ময়ের উৎস আসলে কী?
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, এই মহাবিশ্ব মূলত একটি নির্জীব, চেতনাহীন বস্তুপিণ্ড। আর মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী হলো সেই নির্জীব পদার্থের এক জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল। অর্থাৎ, কোটি কোটি বছর ধরে জড় পদার্থে বিক্রিয়া হতে হতে হঠাৎ একদিন আকস্মিকভাবে চেতনা বোধের জন্ম হয়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে কোয়ান্টাম ফিজিকস এবং দর্শনের একটি প্রাচীন শাখা প্যানসাইকিজম এই ধারণাকে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তারা বলছে, চেতনা মহাবিশ্বের কোনো পরবর্তী উদ্ভাবন নয়; বরং এটি সৃষ্টির শুরু থেকেই পদার্থের ভেতরে মিশে থাকা মৌলিক গুণ।
আমাদের মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলছে!দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, এই মহাবিশ্ব মূলত একটি নির্জীব, চেতনাহীন বস্তুপিণ্ড। আর মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী হলো সেই নির্জীব পদার্থের এক জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল।
চেতনার সহজ সমস্যা বনাম কঠিন সমস্যা
আমরা যদি একটি আধুনিক কম্পিউটার বা রোবটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সেটি কোটি কোটি তথ্য প্রক্রিয়া করতে পারছে। মানুষের মস্তিষ্কও এক অর্থে একটি অসাধারণ জৈব-কম্পিউটার। আমাদের চোখ যখন কোনো লাল গোলাপ দেখে, তখন চোখ থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত মস্তিষ্কের ভিজুয়াল কর্টেক্সে পৌঁছায় এবং মস্তিষ্ক হিসাব করে বলে দেয়, ‘এটি একটি লাল গোলাপ’। স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স খুব সহজেই এই পুরো যান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করতে পারে। একে বলা হয় চেতনার সহজ সমস্যা।
কিন্তু আসল রহস্য শুরু হয় এরপর। বিজ্ঞান যখন এই যান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে, তখন সে একটি মৌলিক জায়গায় এসে থমকে যায়: মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছোটাছুটি করার কারণে আমাদের ভেতরে লাল রঙের সেই নির্দিষ্ট অনুভূতি বা অভিজ্ঞতাটি কেন তৈরি হয়?
বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ডেভিড চালমার্স একেই বলেছেন হার্ড প্রবলেম। একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনি ব্যথার একটি পিল হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। বিজ্ঞান আপনাকে বলতে পারবে এই কেমিক্যালের আণবিক গঠন কী। কিন্তু আপনি যখন সেই পিলটি না খেয়ে মনের কষ্টে কাঁদেন, তখন আপনার ভেতরের সেই দুঃখের অনুভূতিকে কোনো ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবে মাপা যায় না। আমাদের মস্তিষ্ক যদি শুধুই কতগুলো অন্ধ, জড় পরমাণুর সমষ্টি হয়, তাহলে সেই পরমাণুগুলোর ভেতর থেকে কীভাবে আনন্দ বা বেদনার মতো জীবন্ত অভিজ্ঞতার জন্ম হতে পারে? জড় ইট জোড়া দিয়ে বাড়ি বানানো যায়, কিন্তু সেই বাড়িতে কি কখনো অনুভূতির জন্ম হয়? বস্তুগত বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত এই অনুভূতির আদি উৎস খুঁজে পায়নি।
এই হার্ড প্রবলেমের একটি চমৎকার সমাধান দেয় প্যানসাইকিজম। গ্রিক শব্দ প্যান মানে সর্বব্যাপী এবং সাইকি মানে মন বা চেতনা। সহজ কথায়, প্যানসাইকিজম বিশ্বাস করে, চেতনা শুধু মানুষের মস্তিষ্কের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, বরং তা এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার গভীরে লুকিয়ে আছে।
অচেনা রাস্তায় মস্তিষ্ক কীভাবে নতুন পথ খুঁজে নেয়আমাদের চোখ যখন কোনো লাল গোলাপ দেখে, তখন চোখ থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত মস্তিষ্কের ভিজুয়াল কর্টেক্সে পৌঁছায় এবং মস্তিষ্ক হিসাব করে বলে দেয়, ‘এটি একটি লাল গোলাপ’।
আদিম সচেতনতা এবং কোয়ান্টাম মেকানিকস
অবশ্য এর মানে এই নয় যে, আপনার হাতের স্মার্টফোনটি বা ঘরের টেবিলটি মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে বা তাদের নিজস্ব কোনো মন আছে। প্যানসাইকিজম বলে, মহাবিশ্বের প্রতিটি মৌলিক কণা, যেমন একটি ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক তাদের নিজস্ব স্তরে অত্যন্ত সরল ও আদিম একধরনের সচেতনতা বহন করে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন প্রোটো-কনশাসনেস বা আদিম সচেতনতা। এটি মানুষের জটিল চিন্তার মতো নয়, বরং এটি হলো পরিবেশের সঙ্গে কণাগুলোর একধরনের সংবেদনশীল সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা।
আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিকসে আমরা একটি অদ্ভুত ঘটনা দেখতে পাই, যাকে বলা হয় মেজারমেন্ট প্রবলেম বা পরিমাপের সমস্যা। ল্যাবরেটরিতে দেখা গেছে, একটি ইলেকট্রন যতক্ষণ কোনো পর্যবেক্ষকের নজরে না আসছে, ততক্ষণ সেটি একটি নির্দিষ্ট কণা হিসেবে আচরণ করে না। সেটি তখন তরঙ্গের মতো অসংখ্য সম্ভাব্য অবস্থায় একসঙ্গে ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু যে মুহূর্তে কোনো চেতনা বা পর্যবেক্ষক তাকে দেখে, অমনি সে তার সব রূপ ত্যাগ করে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কণা হিসেবে ধরা দেয়। একে বলা হয় তরঙ্গের কলাপ্স।
প্রশ্ন হলো, একটি কণা কীভাবে বোঝে যে তাকে কেউ দেখছে? প্যানসাইকিজমের আলোকেই কেবল এর উত্তর দেওয়া সম্ভব। কণাটির ভেতরে একধরনের প্রাথমিক সংবেদনশীলতা বা আদিম সচেতনতা কাজ করে, যা তাকে বাইরের জগতের সঙ্গে এই রহস্যময় মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নিতে সাহায্য করে। এটিই চেতনার ক্ষুদ্রতম এবং আদিমতম সংস্করণ।
পঞ্চইন্দ্রিয় না হয়ে সপ্তইন্দ্রিয় হলে মস্তিষ্ক সবচেয়ে ভালো কাজ করত, দাবি বিজ্ঞানীদেরপ্যানসাইকিজম বলে, মহাবিশ্বের প্রতিটি মৌলিক কণা, যেমন একটি ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক তাদের নিজস্ব স্তরে অত্যন্ত সরল ও আদিম একধরনের সচেতনতা বহন করে।
ঐকতানের তিনটি স্তর
এখন মনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে, যদি সবকিছুর মধ্যেই চেতনা থাকে, তাহলে এখানে বিবর্তিত মানে শূন্য থেকে হঠাৎ চেতনার জন্ম হওয়া নয়, বরং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদি সচেতনতাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে একত্রিত করে আরও শক্তিশালী ও জটিল চেতনার রূপ দেওয়া। একে আমরা তিনটি স্তরে ভাগ করে বুঝতে পারি।
১. পরমাণু স্তর
একটি নদীর তীরে পড়ে থাকা পাথরের কথা ভাবুন। সেই পাথরের ভেতরেও কোটি কোটি পরমাণু আছে এবং প্রতিটি পরমাণুর নিজস্ব আদিম চেতনা আছে। কিন্তু পাথরের ভেতরের এই পরমাণুগুলো কোনো সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে নেই। তারা যে যার মতো বিচ্ছিন্ন। ফলে, কোটি কোটি পরমাণুর চেতনা থাকা সত্ত্বেও, পাথরটির সামগ্রিক কোনো একক চেতনা বা ‘আমি’ বোধ তৈরি হয় না। এটি যেন একটি স্টেডিয়ামের হাজারো মানুষের মতো, যেখানে সবাই একসঙ্গে নিজ নিজ ভাষায় চিৎকার করছে। ফলে কোনো স্পষ্ট অর্থ তৈরি হচ্ছে না।
মস্তিষ্ক কীভাবে আলাদা শব্দ বুঝতে পারেএকটি নদীর তীরে পড়ে থাকা পাথরের কথা ভাবুন। সেই পাথরের ভেতরেও কোটি কোটি পরমাণু আছে এবং প্রতিটি পরমাণুর নিজস্ব আদিম চেতনা আছে।
২. জৈবিক স্তর
কোটি কোটি বছরের পরিবর্তনের মাধ্যমে যখন এককোষী জীব থেকে বহুকোষী প্রাণী এবং সবশেষে জটিল স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কের জন্ম হলো, তখন পরিস্থিতি বদলে গেল। মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে তীব্র গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে শুরু করল। বিচ্ছিন্ন পরমাণুগুলো এবার কাজ করা শুরু করল একটি সুসংগঠিত দলের মতো।
৩. কোয়ান্টাম সংহতি
বিখ্যাত পদার্থবিদ স্যার রজার পেনরোজ এবং অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট স্টুয়ার্ট হ্যামারফ যৌথভাবে একটি তত্ত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতরে মাইক্রোটিউবিউলস নামে অতি ক্ষুদ্র কিছু নলাকার কাঠামো থাকে। এই কাঠামোর ভেতরে কোটি কোটি পরমাণুর আদিম সচেতনতাগুলো কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট বা কোয়ান্টাম বন্ধনে আবদ্ধ হয়। যখন এই লাখ লাখ কণা এক সুরে স্পন্দিত হয়, তখন বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাগুলো এক হয়ে একটি অবিভাজ্য, শক্তিশালী এবং একক ‘আমি’ বা মানব চেতনার জন্ম দেয়। এটি ঠিক যেন সেই স্টেডিয়ামের হাজারো মানুষের এক সুরে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মতো, যা থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও অর্থপূর্ণ মহিমান্বিত সুরের সৃষ্টি হয়।
একটি মাত্র কোষ থেকে কীভাবে তৈরি হয় মস্তিষ্কমানুষের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে তীব্র গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে শুরু করল। বিচ্ছিন্ন পরমাণুগুলো এবার কাজ করা শুরু করল একটি সুসংগঠিত দলের মতো।
দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি
প্যানসাইকিজমের এই রূপটিকে আরও সহজ করে তোলে ডুয়াল অ্যাসপেক্ট মনিজম বা দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মূল উপাদান আসলে একটিই, কিন্তু তাকে দেখার চোখ দুটি। পদার্থ এবং চেতনা মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, আপনি যখন একটি সুস্বাদু চকোলেট খাচ্ছেন, তখন বাইরে থেকে একজন নিউরোসার্জন যদি আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যান করেন, তবে তিনি কেবল কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং বৈদ্যুতিক তরঙ্গের ওঠানামা দেখতে পাবেন। এটি হলো মুদ্রার এক পিঠ, যাকে আমরা বলি পদার্থ বা বস্তুগত রূপ।
কিন্তু ঠিক একই সময়ে, আপনার ভেতরের জগতে কী ঘটছে? আপনি সেই চকোলেটের এক স্বর্গীয় মিষ্টি স্বাদ অনুভব করছেন! এই স্বাদ বা অনুভূতিকে কিন্তু ডাক্তার তার স্ক্যানারে দেখতে পাবেন না। এটি হলো সেই একই মুদ্রার অপর পিঠ, যাকে আমরা বলি চেতনা বা অভ্যন্তরীণ রূপ। অর্থাৎ, আমরা যখন মহাবিশ্বকে বাইরে থেকে বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখি, তখন তাকে পদার্থ মনে হয়। আর যখন সেই একই জগতকে ভেতর থেকে ব্যক্তিমানসে অনুভব করা হয়, তখন সেটিই চেতনা হিসেবে ধরা দেয়। মহাবিশ্ব আসলে মৃত নয়, এটি আদি-অন্তহীনভাবে সচেতন, কেবল তার প্রকাশের রূপ ভিন্ন।
মস্তিষ্ক যেভাবে নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেআমরা যখন মহাবিশ্বকে বাইরে থেকে বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখি, তখন তাকে পদার্থ মনে হয়। আর যখন সেই একই জগতকে ভেতর থেকে ব্যক্তিমানসে অনুভব করা হয়, তখন সেটিই চেতনা হিসেবে ধরা দেয়।
আমরা নক্ষত্রেরই অংশ
প্যানসাইকিজমের এই পরম সত্যটি আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং এই মহাবিশ্বের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আমরা এই নিষ্ঠুর, জড় এবং অন্ধকার মহাবিশ্বের বুকে হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা বা রাসায়নিক খামখেয়ালির শিকার নই। আমরা জড় কোনো পদার্থের স্তূপ থেকে হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন জীব নই; বরং আমরা এই সচেতন মহাবিশ্বেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কার্ল সাগান একবার বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি’। আপনার মস্তিষ্কের ভেতরে আজ যে পরমাণুগুলো চিন্তা করছে, বিলিয়ন বছর আগে সেগুলো হয়তো কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রের জ্বলন্ত গর্ভে ছিল। প্যানসাইকিজম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সেই পরমাণুগুলো শুরু থেকেই তাদের ভেতর এক সুপ্ত আদিম চেতনা বহন করে আসছিল।
কোটি কোটি বছরের পরিবর্তন চিরন্তন চেতনাকে একটি নিখুঁত আয়নার দিকে ধাবিত করেছে। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজ মানুষ যখন রাতের আকাশের দিকে তাকায়, তখন আসলে মানুষ নক্ষত্র দেখে না, বরং এই সচেতন মহাবিশ্বই মানুষের চোখের মধ্য দিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজেকে চিনতে পারে, নিজের সৌন্দর্য নিজে আস্বাদন করে।








