রপ্তানি আয়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার পিছিয়ে থেকে শেষ হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছর। বিদায়ী অর্থবছরে দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৮ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। তবে বছরের শেষ মাস জুনে প্রায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন (৪৮০০ কোটি ১৯ লাখ) ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন (৪৮২৮ কোটি ৩৯ লাখ) ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২৮ কোটি ডলার। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে টানা দ্বিতীয় অর্থবছরের মতো রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে গেল।

তবে শেষ দিকে রপ্তানিতে ইতিবাচক গতি দেখা গেছে। জুনে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি ২৭ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুনে রপ্তানি আয় ছিল ৩৩৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এর ফলে এপ্রিল, মে ও জুন—টানা তিন মাস রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগে টানা আট মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী ছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শেষ দিকে ক্রয়াদেশ বাড়া এবং কিছু চালান জুনে রপ্তানি হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে এটিকে স্থায়ী প্রবণতায় রূপ দিতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জুনের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও পুরো অর্থবছরের ফলাফলই আসল চিত্র তুলে ধরে। তাঁর মতে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং রপ্তানি আয় কমে যাওয়া স্পষ্ট করে, বৈশ্বিক বাজারের দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে।

ড. জাহিদ বলেন, শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকি বাড়বে। উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশ এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবেদন বলছে, বরাবরের মতো রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক খাত। জুনে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ। মাসটিতে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে নিট পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ২৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে এ খাত থেকে এসেছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

শুধু পোশাক নয়, জুনে অন্যান্য রপ্তানি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে ৭৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৫৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ৪৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং কৃষিপণ্যে ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বছরের শেষ দিকে ক্রয়াদেশ বাড়লেও প্রথম দিকের ধীরগতির প্রভাব পুরো অর্থবছরের ফলাফলে পড়েছে। শুধু ক্রয়াদেশ বাড়লেই হবে না। উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।