দেশের পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম পর্যালোচনা, ডিএসইকে আরও ক্ষমতায়ন, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডে (সিডিবিএল) ডিএসইর মালিকানা বৃদ্ধি, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশে (সিসিবিএল) ডিএসইর নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইপিও দ্রুত আনা এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এসআরও) গঠন এখন সময়ের দাবি।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ডিবিএ আয়োজিত ‘পরিচিতি ও মতবিনিময়’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম প্রণয়নের সময় পাঁচ বছর পর এটি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু প্রায় ১২ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত সেটি পর্যালোচনা করা হয়নি। ডিবিএ এরই মধ্যে কমিশনের কাছে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিয়েছে। খুব বড় ধরনের পরিবর্তন নয়, বরং এমন কিছু সংশোধন চাওয়া হয়েছে, যা ডিএসইকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, ডিএসইর ক্ষমতায়ন করতে হলে এর সাংগঠনিক কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করতে হবে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের আগে ডিএসই যেভাবে পরিচালিত হতো, পরে সেই কাঠামো থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে বলে ডিবিএর ধারণা। তাই স্টক এক্সচেঞ্জকে শক্তিশালী করতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
বিএসইসি চেয়ারম্যান / ত্রৈমাসিক নয় সংক্ষিপ্ত হবে আর্থিক প্রতিবেদন, সহজ হবে আইপিও প্রক্রিয়া
সিডিবিএলের মালিকানা নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি গঠনের সময় ডিএসই আর্থিকভাবে শক্তিশালী না থাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ শেয়ার নিতে পারেনি। অথচ গত দুই দশকে সিডিবিএলের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ডিএসই থেকে, কিন্তু ডিএসইর মালিকানা মাত্র ১৩ শতাংশ। এই বাস্তবতা ন্যায্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ (সিসিবিএল) প্রসঙ্গে ডিবিএ সভাপতি বলেন, ২০১৮ সালে ডিএসই ১৩৫ কোটি টাকা সাবস্ক্রাইব করলেও প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়নি। এদিকে অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলেও কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।
তার মতে, যেহেতু সিসিবিএলের প্রায় ৯৮ শতাংশ রাজস্ব ডিএসইভিত্তিক লেনদেন থেকে আসবে, তাই এটি ডিএসইর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএসইর ৪৫ শতাংশ অংশীদারত্ব অত্যন্ত কম। এটি বাড়িয়ে অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ করা প্রয়োজন। বাকি ১০ শতাংশ সিডিবিএল বা অন্য কোনো অংশীদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ নতুন করে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
সিসিবিএলের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হলেও শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এর অর্ধেক ব্যয়েই একই ধরনের প্রযুক্তি স্থাপন সম্ভব। বিষয়টি নতুন বোর্ডকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
আইপিও সংকট নিয়ে ডিবিএ সভাপতি বলেন, বহু বছর ধরেই বাজারে ভালো আইপিওর ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি খাত থেকে রাতারাতি আইপিও আনা সম্ভব নয়। কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ৯ মাস থেকে এক বছর সময় লাগে।
তাই অন্তর্বর্তী সময়ে সরকারের মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। সরকারের এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। এটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে চলতি বছরের মধ্যেই বাজারে নতুন আইপিও আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিডিবিএলের তালিকাভুক্তির বিষয়টিও দীর্ঘদিনের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি পরিপক্ব ও অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বাজারে যখন আইপিওর খরা চলছে, তখন সিডিবিএল তালিকাভুক্ত না হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সরাসরি তালিকাভুক্তি (ডিরেক্ট লিস্টিং) হলেও ডিবিএর আপত্তি নেই। দ্রুত সিডিবিএলকে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সেলফ রেগুলেটরি অর্গানাইজেশন-এসআরও) গঠনের প্রস্তাব দিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, জাপানের জাপান সিকিউরিটিজ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (জেএসডিএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফিনরা-এর আদলে বাংলাদেশেও এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নীতিনির্ধারণে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তদারকির দায়িত্ব এসআরও পালন করবে। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপও কমবে।
তিনি বলেন, বাজারকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হলে শুধু সূচক বা লেনদেন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না, মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়ন্ত্রক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বাজার উন্নয়নের কাজও করতে চেয়েছে। কিন্তু বাজার উন্নয়ন, আইপিও আনা বা বিনিয়োগ প্রচারণা কমিশনের মূল দায়িত্ব নয়। এসব কাজ মার্চেন্ট ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট বাজার অংশীজনদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংক যদি আইপিও আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন মার্চেন্ট ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আইপিও আনার দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের কাছেই থাকা উচিত, ব্রোকিং কার্যক্রম ব্রোকারদের হাতে এবং মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার দায়িত্ব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (এএমসি) কাছেই থাকা উচিত।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে রোডশোর নামে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল কর্মসূচি হয়েছে, যেখানে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও জোরপূর্বক অর্থ নেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থেকে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্বের মধ্যে থেকেই কাজ করা উচিত।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- বিএসইসির কমিশনার নাহিদ মাহতাব, তানভীর হাবিব রহমান ও নাফিজ আল তারিক, ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার প্রমুখ।
এমএএস/ইএ








