দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়নে একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। একইসঙ্গে এ খাতের বিকাশে শুল্ক কাঠামোর সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত সহায়তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার (২৫ জুলাই) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘রাসায়নিক নির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, শিল্প নীতিমালা সংস্কারের কাজ চলমান। রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন, নাকি বিদ্যমান শিল্পনীতিতে নতুন অধ্যায় সংযোজনই যথেষ্ট হবে- সে বিষয়ে উদ্যোক্তারা সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিলে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও ওষুধশিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেকাংশে রাসায়নিক পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ রং, রাসায়নিক ও বিশেষায়িত কাঁচামাল এখনও আমদানিনির্ভর। এর সঙ্গে উচ্চ শুল্ক, পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, দেশের রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) সদস্য আবুল ফাতাহ মো. বালিগুর রহমান শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিসিএসআইআরের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পণ্য শিল্প উদ্যোক্তারা ব্যবহার করলে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিশ্চিত ও সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এস আর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী। তিনি জানান, দেশের রাসায়নিক বাজারের আকার বর্তমানে ৬ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাসায়নিক আমদানি করেছে, যার বড় অংশ তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

তিনি বলেন, লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা, উচ্চ শুল্ক, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং কার্যকর সাপ্লাই চেইনের অভাব এ খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধানে যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তৈরি পোশাক খাতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উন্নয়ন যেভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, রাসায়নিক শিল্পেও একই ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রাসায়নিক উৎপাদন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এম. মোসাদ্দেক হোসেন দেশে শক্তিশালী কেমিক্যাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন বলেন, এপিআই শিল্পপার্কের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতির কারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশ এগ্রো-কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এ খাতের বিকাশে বড় বাধা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি জানান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রপ্তানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা জানান, স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে আনা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক বলেন, শিল্পে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনারে ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং রাসায়নিক শিল্প সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইএইচটি/এএমএ