ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে (রাসিক) বদলি হয়ে আসা বিতর্কিত ও ‘দুর্নীতিবাজ’ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকেরকে নিয়ে রাজশাহী নগরভবন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে অস্বস্তি বিরাজ করছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে মার্চে ওই প্রকৌশলীকে ডিএসসিসি থেকে রাসিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

রাসিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত প্রকৌশলী বাকের রাজশাহীতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরই পুরো নগরভবন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। রাজশাহী নগরীতে চলমান বিভিন্ন মেগা প্রকল্পগুলোর প্রকল্প পরিচালকও হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘোর আপত্তির মুখে রাসিক প্রশাসক তাকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে। বাকের বর্তমানে রুটিন কাজগুলো করলেও তার কাজে সন্তুষ্ট নন প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাকের রাসিকে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নগরভবনে অস্বস্তি বিরাজ করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে। ডিএসসিসিতে তার বেপরোয়া দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনই এর অন্যতম কারণ। রাজশাহী নগরভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, এ ধরনের বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে রাজশাহী থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। তাকে ডিএনসিসি থেকে রাসিকে বদলি না করে মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা উচিত ছিল। তার দুর্নীতির অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধান পর্যায়ে চলমান থাকায় বর্তমানে সরকারের কোনো সংস্থাতেই তাকে পদায়ন করা উচিত নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাসিকের এক কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয়ে বাকেরের আস্থাভাজন কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা তাকে বিভিন্ন প্রকল্পের পিডি করতেও রাসিক কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ ও সুপারিশ করেছেন। কিন্তু সম্ভাব্য দুর্নীতির আশঙ্কায় বাকেরকে কোনো প্রকল্প দেওয়ার বিপক্ষে রাসিকের কর্মকর্তারা। তার সঙ্গে কেউই কাজ করতেও অস্বস্তিবোধ করছেন। এতে রাসিকের সামগ্রিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

জানা গেছে, বাকেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সাবেক সরকারের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অবাধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তার দুর্নীতি নিয়ে জাতীয় গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব নিয়ে রাসিক কর্তৃপক্ষ বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে।

সূত্র মতে, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি খায়রুল বাকেরের বিপুল অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তিসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন জমা পড়ে। পাশাপাশি এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ২০২৫ সালের ১৮ জুন ফেসবুকে বাকেরকে নিয়ে পোস্ট দেন। তাতে তিনি লেখেন, ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মালিক। এরপর এনসিপির পক্ষ থেকে দুদকে অভিযোগ দেওয়া হয়, যা বর্তমানে অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে।

দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন বাকের। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাকের হয়ে ওঠেন সাবেক মেয়র তাপসের ডান হাত। নির্দিষ্ট কমিশন ছাড়া কোনো প্রকল্প দিতেন না। নগদ টাকা ছাড়াও তার সম্পদের পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকার বেশি। জুলাই আন্দোলন দমনে খায়রুল বাকের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে বুধবার রাজশাহী নগরভবনে প্রকৌশলী খায়রুল বাকেরের দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাৎ চাওয়া হলে তার অফিস সহকারী ভেতরে যান। ১৫ মিনিট পর বেরিয়ে এসে তিনি জানান, স্যার কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন না। ফোন ধরেও তিনি কোনো কথা বলতে অস্বীকার করেন।

খায়রুল বাকেরের বিষয়ে জানতে চাইলে রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন জানান, তিনি যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন আইনের মাধ্যমেই তার প্রতিকার হবে। যেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে রাসিকে পাঠিয়েছে বিষয়টি তাদেরই দেখার কথা।