ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধপ্রচেষ্টা স্তব্ধ করার লক্ষ্যে মস্কোর ওপর নতুন এবং অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় বিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদন করেছে মার্কিন সিনেট।

গতকাল শুক্রবার সিনেটে বিলটি ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়। প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্র্যামের প্রায় এক বছরব্যাপী ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলস্বরূপ এই বিলটি পাস হলো। দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন জোরদার করা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে কোণঠাসা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত এই আইনে রাশিয়া থেকে যারা জ্বালানি তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য আমদানি অব্যাহত রাখবে, সেসব দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পুতিন যে রাজস্ব পাচ্ছেন, তা বন্ধ করে দেওয়া। চীন ও ভারতের মতো রাশিয়ার জ্বালানির প্রধান ক্রেতা দেশগুলো এই আইনের আওতায় সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।

ইউক্রেনের প্রতি স্পষ্ট বার্তাগত সপ্তাহে সিনেটর লিন্ডসে গ্র্যামের শেষকৃত্যে অংশ নিতে ক্যাপিটল হিলে এসেছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সে সময় তিনি মার্কিন সিনেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং ক্যাপিটল গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে এই বিলের প্রাথমিক ভোটাভুটি পর্যবেক্ষণ করেন।

বিল পাসের পর কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেন, ‘আজ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ইউক্রেন থেকে এবং পুতিন মস্কো থেকে এটি পর্যবেক্ষণ করছেন। আজ আমরা ইউক্রেনের জনগণকে বলছি: আপনারা একা নন। আর ভ্লাদিমির পুতিনকে বলছি: আপনি ইউক্রেন জয় করতে পারবেন না।’

চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট কালে এটি মার্কিন কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।

ইউক্রেনে মার্কিন অর্থ ও সামরিক সহায়তা বজায় রাখা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে দীর্ঘদিন ধরে নানা টানাপোড়েন থাকলেও, ট্রাম্প এই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে সম্মতি দিয়েছেন। ফলে বিলটি চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য এখন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস) পাঠানোর পথ সুগম হলো।

এই প্যাকেজের অধীনে রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের ওপর বাণিজ্য শুল্ক আরোপের সুযোগ পাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং পর্যায়ক্রমে তা কমানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আইনটিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং রাশিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা। রাশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি খাতের প্রকল্পগুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ। বিদ্যমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা পুরোনো তেল ট্যাংকারগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্প্রসারণ।

তবে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট ইচ্ছা করলে নির্দিষ্ট শর্তে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা মওকুফ করতে পারবেন—এমন ধারাও বিলে যুক্ত রয়েছে।

শুল্ক আরোপ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক বিলটি সিনেটে বিপুল ভোটে পাস হলেও ট্রাম্পকে বিস্তৃত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে কিছু আইনপ্রণেতার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের মতে, আমদানিকৃত পণ্যে নতুন শুল্ক বসানো হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে যারা বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই প্রোগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাট ও কয়েকজন রক্ষণশীল রিপাবলিকান। কেনটাকি রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল এবং ওরেগনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা বাতিলের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন, যা ৩২-৬৪ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়।

রন ওয়াইডেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ এমনিতেই অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, তাদের ওপর নতুন শুল্কের বোঝা চাপানো ঠিক হবে না।’

তবে ডেমোক্র্যাট সিনেটর রাফায়েল ওয়ার্নক জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর তিনি বিলে সমর্থন দেন। ওই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কোনো দেশ রাশিয়ার জ্বালানি কেনা বন্ধ করলে বা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য না করলে তাদের ওপর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক তুলে নেওয়া হবে।

মার্কিন সিনেটের এই পদক্ষেপের পর এখন সবার নজর প্রতিনিধি পরিষদের দিকে। আগস্টের শেষ নাগাদ প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে বিলটি সেখানে উত্থাপিত হবে। প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিঙ্কস সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প যেন শুল্ককে অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন জনগণের ক্ষতি করতে না পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না যার খেসারত শেষ পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদের দিতে হয়।’

এদিকে, মার্কিন সিনেটের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিব্যিহা। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বলিষ্ঠ সমর্থনের মাধ্যমে দুই দেশ যৌথভাবে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।