হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও সংঘাতে জড়িয়েছে। মঙ্গলবার রাতভর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইরানও বাহরাইন এবং কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজে অজ্ঞাত বস্তুর আঘাত হানার জেরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে এ উত্তেজনা বাড়ল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত ১৭ জুন ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো হরমুজ নিয়ে এ সংঘাত ঘটল। এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তুরস্কের আনকারায় ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা সময় নষ্ট করা ছাড়া কিছু নয়। ট্রাম্প বলেন, কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই ইরানকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করত পারে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার রাতেও ইরানে হামলা চালানো হতে পারে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, তেহরান পিছু হটবে না বা আত্মসমর্পণ করবে না। আলজাজিরা জানায়, হরমুজ প্রণালিতে ইরান কয়েকটি জাহাজে আঘাত হেনেছে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ পালটাপালটি হামলা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কার্যকলাপ পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানায়, ইরানের ওপর তাদের হামলা মঙ্গলবার শুরু হয়; হরমুজে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেন্টকম জানায়, হামলার চার ঘণ্টা পর তারা ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী অস্ত্র দিয়ে ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে’ আঘাত হেনেছেন। ইরানের সামরিক নেতারা এ হামলার বিরুদ্ধে ‘কঠোর ও চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় তারা কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবেন না। পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি জানায়, এ হামলার জবাবে তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, তারা দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
বিবৃতির বরাত দিয়ে বিবিসি লিখেছে, মার্কিন আগ্রাসনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসির নৌ ও মহাকাশ ইউনিট যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযানের মাধ্যমে পোর্ট সালমান, বাহরাইনের পঞ্চম সামুদ্রিক অঞ্চল ও কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।
এমন এক সময়ে এ উত্তেজনা ছড়াল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে সেখানে অবস্থান করছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত মাসে হওয়া সেই চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনার কথা ছিল। তবে এখনো কোনো দেশই আলোচনা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি।
বুধবার সকালে ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটে ইরানের ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন হামলাকে ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেন। তিনি যুক্তি দেন-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করায় এর বিরুদ্ধে ‘জোরালো প্রতিক্রিয়া’ দেখানো জরুরি ছিল। তবে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। কারণ যে অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছে, তাতে হরমুজ ইরানের নিয়ন্ত্রণে, জাহাজ চলাচলের কথা ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ পরিবারের কয়েক সদস্যকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। একই দিনে মিনাবে একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ১৬৮ শিশু হত্যা করা হয়। এরপরই পালটা হামলা শুরু করে ইরান।
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী সিরিকে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। সেখানে বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জেটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এছাড়া কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী এলাকাগুলোতেও বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ইরানের ওপর প্রাথমিক হামলার কয়েক ঘণ্টা পর কুয়েত ও বাহরাইনেও সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সিরিক বাণিজ্যিক জেটিতে ধাতব টুকরোর (শার্পনেল) আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক তৌহিদ আসাদি জানান, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে-কেশম দ্বীপে ছয়টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হরমুজ প্রণালির নিকটস্থ দ্বীপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সিরিক বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। এ বন্দরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর নজরদারি করা হয়। এটি এমন একটি কৌশলগত অবস্থান যা ব্যবহার করে ইরান প্রণালিটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখে। এ অবস্থায় ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিতে ইরাকে যাওয়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হামলার খবরে দেশে ফিরে আসেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনকে এ পরিস্থিতির পরিণতির জন্য দায়ী করেছে। জুনে হওয়া সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী ইরানের তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য শিথিল করতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে চুক্তি সইয়ের ২০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সেই সাময়িক সিদ্ধান্ত বাতিলের পদক্ষেপ নেয়। মন্ত্রণালয়টি জুন মাসে ঘোষিত একটি অনুমোদন বাতিল করে, যার আওতায় ইরানকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
ইরান পিছু হটবে না বা আত্মসমর্পণ করবে না-গালিবাফ : ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ গালিবাফ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘সমঝোতা স্মারকের গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসাবে অভিহিত করেন। তিনি ‘দক্ষিণ ইরানে হামলা’র ঘটনাকেও এর লঙ্ঘন হিসাবে উল্লেখ করেন।
পালটাপালটি হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের আলোচনা দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ‘আমরা পিছু হটা বা আত্মসমর্পণ করার পাত্র নই।’ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো উল্লেখ করে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘দাদাগিরি এবং ব্ল্যাকমেইলের দিন শেষ, আপনারা কোথাও পৌঁছতে পারবেন না।’






