মহাবিশ্বের কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে প্রকৃতি নিজেকে টিকিয়ে রাখার অদ্ভুত সব কৌশল তৈরি করেছে। পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত রেইনফরেস্ট বা চিরহরিৎ বনাঞ্চলগুলো তেমনই বহু অমীমাংসিত রহস্যে ঘেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সময়ে প্রকৃতির এক নতুন ও বিস্ময়কর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প মালয়েশিয়ার জঙ্গল থেকে উন্মোচিত হয়েছে।
মালয়েশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বিশাল গাছ। গাছগুলো মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটারের বেশি উঁচু। প্রতিদিন এই গাছগুলো শিকড় থেকে পানি টেনে একেবারে চূড়ার পাতা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, খরার সময় এই বিশাল গাছগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অভিকর্ষ বলের কারণে এত উঁচুতে পানি পৌঁছানো কঠিন কাজ। তবে নতুন এক গবেষণা বিজ্ঞানীদের এই পুরোনো ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন গাছগুলোর এক অসাধারণ শারীরিক কৌশল। এই কৌশলের কারণে পানির চরম সংকটেও গাছগুলো অনায়াসে বেঁচে থাকে। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত একটি গবেষণা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গবেষণাটি বদলে দিয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞানের বহু বছরের পুরোনো ধারণা। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এ সময়ে বড় গাছগুলোর টিকে থাকার নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সটার ও সাউথইস্ট এশিয়া রেইনফরেস্ট রিসার্চ পার্টনারশিপের গবেষকেরা যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করেন। তাঁরা মালয়েশিয়ার সাবাহ অঞ্চলের কাবেলি–সেপিলক ফরেস্ট রিজার্ভের ৩৮টি ডিপ্টেরোকার্প প্রজাতির গাছের ওপর পরীক্ষা চালান। এই গাছগুলো ৭ দশমিক ৭ মিটার থেকে শুরু করে ৭১ মিটারের বেশি লম্বা ছিল। সবচেয়ে বড় গাছটির উচ্চতা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রায় তিন–চতুর্থাংশ। গবেষণার পদ্ধতিটি ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। পেশাদার গাছে চড়িয়েরা সূর্য ওঠার আগেই বিশাল গাছগুলোর ডালে চড়ে বসেন। তাঁরা সারা দিন ধরে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে গাছের পাতা, ডাল ও কাণ্ড সংগ্রহ করেন। গবেষক দলের সদস্যরা গাছের পানি পরিবহনের ২৫টি বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করেন। ক্রান্তীয় অঞ্চলের বড় গাছের ওপর এটি এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় জলবাহী প্রক্রিয়াসংক্রান্ত গবেষণা।
গাছ যত লম্বা হয়, শিকড় থেকে পাতায় পানি পৌঁছানোর পথ তত দীর্ঘ হয়। পানির নালির ভেতরের ঘর্ষণ ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পানি চলাচলের গতি কমিয়ে দেয়। এর ফলে খরার সময় বড় গাছগুলো শুকিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ডিপ্টেরোকার্প গাছগুলো এই বাধা দারুণভাবে কাটিয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, লম্বা গাছগুলো তাদের কাণ্ডের নিচের অংশে পানির নালি বা জাইলেম ভেসেল তুলনামূলক বেশি চওড়া বা মোটা করে তৈরি করে। চওড়া নালির কারণে ঘর্ষণ কমে যায় এবং পানি সহজে ও দ্রুত ওপরে উঠে যায়। একই সঙ্গে গাছের মগডালের পাতাগুলো কম পানির চাপে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করে। পাতাগুলোর এই বিশেষ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে কম পানিতেও কোষ নষ্ট হয় না। এই দুই শারীরিক পরিবর্তনের কারণে চরম উচ্চতাতেও পানি চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তীব্র এল নিনো খরার সময়ে। খরায় রেইনফরেস্টের পানির স্তর অনেক নেমে গিয়েছিল। অবাক করার বিষয় হলো, খরা সত্ত্বেও বড় গাছগুলোর বৃদ্ধির গতি একটুও কমেনি। ছোট গাছগুলোর মতোই বড় গাছগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে। গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন, ডিপ্টেরোকার্প পরিবারের গাছগুলোর খরা সহনশীলতার সঙ্গে তাদের উচ্চতার কোনো সম্পর্ক নেই। এই আবিষ্কার জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার রেইনফরেস্টগুলোয় ডিপ্টেরোকার্প প্রজাতির গাছ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই বিশাল গাছগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখে। নতুন গবেষণাটি এই পুরোনো বনগুলোকে কার্বন সিংক বা কার্বন শোষক হিসেবে টিকিয়ে রাখার দাবি জোরদার করল। গাছগুলো বিজ্ঞানীদের ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এরা পরিবেশের চাপের সঙ্গে নিজেদের ভেতরের গঠন বদলে নিতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া







