প্রকৃতির আদিম রূপ সব সময় মানুষের চেনা ছকে বাঁধা থাকে না। হাজার বছর আগে আমাদের চিরপরিচিত ফল ও সবজিগুলো দেখতে এবং স্বাদে এমন ছিল না, যা আজ আমরা খাবার টেবিলে দেখি। মানুষের তীব্র ক্ষুধা আর বেঁচে থাকার তাগিদে বুনো জঙ্গল থেকে তুলে আনা সেই আদিম উদ্ভিদগুলো আজ এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করেছে। আমরা যখন গ্রীষ্মের দুপুরে একটুকরা তরমুজ মিষ্টি কোয়া কামড়ে ধরি কিংবা শীতের সকালে মসলা দিয়ে গরম ভুট্টা খাই, তখন আমাদের মাথায় একটি তথ্য রাখা দরকার—এই পরিচিত ফল ও সবজিগুলো সব সময় এত রসালো এবং সুন্দর ছিল না। মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে তার নিজের সুবিধামতো প্রিয় ফসলের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে আসছে।

বিজ্ঞানী এবং গবেষকেরা বলছেন, জিএমও প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার মতো অন্য কোনো জীব থেকে জিন এনে উদ্ভিদের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য তৈরি করা হয়। তবে কৃষকেরা হাজার বছর ধরে অত্যন্ত ধীরগতিতে আরেকটি কাজ করে আসছেন। তা হলো নির্বাচনী প্রজনন বা সিলেকটিভ ব্রিডিং। এই প্রক্রিয়ায় কৃষকেরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালো বৈশিষ্ট্যযুক্ত ফসল বেছে নিয়ে সেগুলোর চাষ করতে থাকেন। কলা থেকে শুরু করে বেগুন—এমন কিছু খাবার রয়েছে, যা মানুষ চাষ করার আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম দেখতে ছিল।

বুনো তরমুজ বনাম আধুনিক তরমুজ

সপ্তদশ শতাব্দীর ইতালীয় চিত্রশিল্পী জিওভানি স্টাঞ্চির একটি বিখ্যাত চিত্রকর্মে এক অদ্ভুত তরমুজের দেখা মেলে। ১৬৪৫ থেকে ১৬৭২ সালের মধ্যে আঁকা এই ছবিতে তরমুজের ভেতরের অংশটি বর্তমানের মতো সম্পূর্ণ লাল নয়। সেখানে ছয়টি ত্রিকোণাকৃতির অংশে ভাগ করা ঘূর্ণমান কিছু বৃত্তাকার খাঁজ দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তরমুজকে এমনভাবে ব্রিডিং বা প্রজনন করিয়েছে, যাতে এর ভেতরে লাল, রসালো অংশ বেশি থাকে। এই লাল অংশটি আসলে উদ্ভিদের অমরা বা প্লাসেন্টা। অনেকে মনে করতে পারেন স্টাঞ্চির পেইন্টিংয়ের তরমুজটি হয়তো কাঁচা ছিল। তবে ছবির ভেতরের কালো বীজগুলো প্রমাণ করে যে তরমুজটি আসলে পাকা ছিল।

বীজে ঠাসা বুনো কলা

পৃথিবীর প্রথম কলা চাষ শুরু হয়েছিল অন্তত ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার বছর আগে। বর্তমানের পাপুয়া নিউগিনি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম এর চাষাবাদ হয়। আধুনিক কলা মূলত দুটি বুনো জাত মুসা অ্যাকুমিনাটা এবং মুসা বালবিসিয়ানার সংকর রূপ। আদিম যুগের সেই বুনো কলাগুলোর ভেতরে থাকত বড় এবং অত্যন্ত শক্ত বীজ। কৃষকদের হাজার বছরের চেষ্টায় তৈরি সংকর জাত থেকে আমরা আজকের সুস্বাদু আধুনিক কলা পেয়েছি। এটি সহজে ধরা যায় এবং খোসাও সহজে ছাড়ানো যায়। আদিম পূর্বপুরুষের তুলনায় বর্তমানের কলার বীজ অত্যন্ত ছোট। এটি স্বাদেও অনেক মিষ্টি এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর।

কাঁটাযুক্ত বুনো বেগুন

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বেগুনের আকার এবং রঙে ছিল বিশাল বৈচিত্র্য। সাদা, নীল, বেগুনি ও হলুদ রঙের বেগুন দেখা যেত বুনো অঞ্চলে। প্রাচীন চীনে প্রথম বেগুনের চাষ শুরু হয়। আদিম সংস্করণের বেগুনগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এদের ডাল বা বোঁটার সংযোগস্থলে ধারালো কাঁটা থাকত। কৃষকদের নির্বাচনী প্রজননের ফলে বেগুনের সেই আদিম কাঁটা সম্পূর্ণ দূর হয়েছে। এর ফলে আমরা আজ ডিম্বাকৃতির বেগুনি রঙের বেগুন কিনতে পাই।

বুনো গাজর

দশম শতাব্দীতে পারস্য এবং এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রথম গাজর চাষের কথা জানা যায়। আদিম গাজরগুলো মূলত বেগুনি কিংবা সাদা রঙের হতো। এগুলোর মূল বা শিকড় ছিল অত্যন্ত পাতলা এবং দ্বিমুখী কাঁটাযুক্ত। পরে এই গাজরগুলো তাদের বেগুনি পিগমেন্ট বা রং হারিয়ে কমলা বর্ণ ধারণ করে। কৃষকেরা এই পাতলা, তীব্র গন্ধযুক্ত বুনো শিকড়টিকে বছরের পর বছর ধরে চাষ উপযোগী করে তোলেন। এর ফলে আজ আমরা বড়, মিষ্টি এবং পুষ্টিগুণে ভরা কমল রঙের গাজর পাচ্ছি।

বুনো ভুট্টা

নির্বাচনী প্রজননের সবচেয়ে বড় এবং আইকনিক উদাহরণ হলো উত্তর আমেরিকার মিষ্টি ভুট্টা। এটি মূলত টিওসিন্ট নামক একটি প্রায় অখাদ্য বুনো ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ থেকে তৈরি করা হয়েছে। রসায়ন শিক্ষক জেমস কেনেডির তৈরি একটি তথ্যচিত্র অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০ অব্দে প্রাকৃতিক ভুট্টার চাষ শুরু হয়। সেই আদিম ভুট্টা ছিল কাঁচা আলুর মতো শক্ত এবং শুকনো। আজকের ভুট্টা ৯ হাজার বছর আগের তুলনায় প্রায় ১ হাজার গুণ বড়। এর খোসা ছাড়ানো এবং চাষ করা এখন অনেক সহজ। জেমস কেনেডির তথ্য অনুযায়ী, আদিম ভুট্টার মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ অংশ চিনি ছিল। সেখানে আজকের আধুনিক ভুট্টার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ অংশ চিনি দিয়ে তৈরি। এই পরিবর্তনের প্রায় অর্ধেকটাই ঘটেছে পঞ্চদশ শতাব্দীর পর, যখন ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা এ ফসলের চাষ শুরু করে।

বুনো পিচফল

আজকের মিষ্টি ও রসালো পিচফল একসময় দেখতে চেরি ফলের মতো ছোট ছিল। এর ভেতরে মাংসল অংশ ছিল খুবই সামান্য। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে প্রাচীন চীনারা প্রথম এই ফলের চাষ শুরু করে। কেনেডির তথ্যমতে, আদিম পিচফলের স্বাদ ছিল মাটির মতো এবং কিছুটা নোনতা, অনেকটা মসুর ডালের মতো। হাজার বছরের নির্বাচনী প্রজননের পর আজকের পিচফল আদিম ফলের চেয়ে ৬৪ গুণ বড় হয়েছে। এটি আগের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি রসালো এবং ৪ শতাংশ বেশি মিষ্টি।

সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার