গত বছর সেপ্টেম্বরের শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়। এটি ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার এ কৃতিত্বের জন্য অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারত, যদি বকেয়া কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এভাবে কমিয়ে আনা যেত। কিন্তু তারা সেটি করতে পারেনি। বরং খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের অপব্যবহার করেছে মাত্র। খেলাপি ঋণের কিস্তি আদায় না করেই ঋণ হিসাব ক্লিন দেখানোর এ প্রক্রিয়াকে দেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ‘কার্পেটের নিচে ময়লা রেখে ঘর পরিষ্কার দেখানো’র কৌশল হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বলতে সাধারণত এমন একটি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একজন ঋণগ্রহীতার বকেয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা হ্রাস বা বর্ধিতকরণ করা হয়। তবে বাস্তবে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বলতে আমরা বুঝি-যেখানে একজন গ্রহীতার ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়। ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা কমানোর প্রয়োজন হয় না। কারণ ঋণগ্রহীতা চাইলে শিডিউলকৃত নির্ধারিত সময়ের আগে যে কোনো দিন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে দিতে পারেন। এতে ব্যাংক বরং খুশিই হবে। বিশেষ যৌক্তিক কোনো কারণে একজন ঋণগ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে তার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে তাকে ঋণখেলাপি তালিকাভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচানোর জন্য সাময়িকভাবে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করে দেয়। পৃথিবীর সব দেশেই ব্যাংক খাতে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ সুবিধা প্রত্যক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায় ১৯৯১ সালে। সে সময় বিএনপি সরকার গঠনের পর উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া শর্তানুযায়ী ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে ১৭১ জন বৃহৎ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করে। তালিকা প্রকাশের পর ঋণখেলাপিদের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। সরকার এ সময় খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ এককালীন ব্যাংকে নগদ ডাউন পেমেন্ট আকারে জমা দিয়ে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়। মূল আইনে ছিল, কোনো একটি প্রকল্পের খেলাপি ঋণ হিসাব সর্বোচ্চ তিনবার পুনঃতফসিলিকরণ করা যাবে। প্রতিবারের মেয়াদ হবে তিন বছর করে। প্রথমবার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বারের জন্য ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট আকারে ব্যাংকে নগদ জমা দিতে হতো।
ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের বড় ধরনের অপব্যবহার করা হয় ২০১৫ সালে। ২০১৪ সালে বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিরোধী দলগুলো সরকারের পতনের দাবিতে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনকভাবে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই সময় সরকারসমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আন্দোলনের সময় তাদের ক্ষতি হয়েছে-এ অজুহাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের এক বিশেষ সুবিধা আদায় করে নেয়, যদিও এ ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছিল ঋণ হিসাব পুনর্গঠন। ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব খেলাপি ঋণের স্থিতিসংবলিত ঋণ হিসাবগুলো ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলিকরণ করে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংক খাতে এর আগে আর কখনোই এভাবে ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করা হয়নি। সে সময় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যদি এ সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে সেটি সবার জন্য কেন অবারিত করা হলো না? কারণ, যারা ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণখেলাপি, তারা কি আন্দোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের বড় অপব্যবহার শুরু হয় সেখান থেকেই। ঋণ হিসাব পুনর্গঠনের নামে ১১টি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে নেয় বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে আ হ ম মোস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নগদ প্রদান সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়। ঋণখেলাপিদের এ ধরনের সুযোগদানের বিষয়ে সে সময় সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
আওয়ামী লীগ আমলে দেশের অর্থনীতির যেসব সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে ছিল ব্যাংক খাত। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু হলে অনেকেই স্বস্তিবোধ করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, ব্যাংক খাতে আর কোনো বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হবে না। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও একই ধরনের সুযোগ প্রদান করে। অক্টোবরে এ সুযোগ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ঋণখেলাপিরা নগদ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট ব্যাংকে জমাদান সাপেক্ষে তাদের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। ব্যাংক আবেদনপ্রাপ্তির পর তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা বা আবেদনকারী ২ বছরে গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য তাদের ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করাতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করেই কেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এমন একটি সুবিধা প্রদান করল ঋণখেলাপিদের? অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক দলের যেসব নেতাকর্মী ঋণখেলাপি, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করার জন্যই এমন একটি সুবিধা দেওয়া হয়। কারণ, জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে কোনো ঋণখেলাপি অংশ নিতে পারেন না। বর্তমান জাতীয় সংসদে ৩৯ জন ঋণখেলাপি সদস্য রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের এ বিশেষ সুযোগ দেওয়া না হলে তাদের পুরো খেলাপি ঋণ একবারে জমা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে হতো। বিশেষ ছাড়ে ৩০০টি শিল্পগোষ্ঠী তাদের ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণ করে নেয়। যারা পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে ঋণ হিসাব নিয়মিত করে নিয়েছেন, তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আর ঋণখেলাপি বলা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের প্রতি কতটা উদার, তার অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যেতে পারে। আগে নিয়ম ছিল কোনো উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে, গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হতো। আওয়ামী লীগ সরকার আমলের শেষদিকে এ আইন পরিবর্তন করা হয়। বলা হয়, কোনো উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়লেও অন্যগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
সম্প্রতি আবারও বাংলাদেশ ব্যাংক একই ধরনের সুযোগ দিয়েছে ঋণখেলাপিদের। এসব ঋণখেলাপির অধিকাংশই ইচ্ছাকৃত ও পরীক্ষিত খেলাপি। এরা রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে চলেছে; কিন্তু যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন, তাদের কোনো সুবিধা দিচ্ছে না। কোনো ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করা হলে তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেলাপি ঋণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না। খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করা হলে সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাবের মালিক যেহেতু নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেলাপি ঋণের দায়মুক্ত হন, তাই তিনি ইচ্ছা করলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন করে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন। কত বড় বৈষম্য! যারা ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা তারা খেলাপি হলে অন্য ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নিতে পারেন না; কিন্তু বিপুল অঙ্কের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিলিকরণ সুবিধা গ্রহণ করলে নতুন করে ঋণ নিতে পারছেন।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রচলিত আইনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। যারা ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের অপব্যবহার করে ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণ করে নিয়েছেন, তাদের সেই সুযোগ প্রত্যাহার করে ঋণ হিসাব খেলাপি হিসাবে গণ্য করে কিস্তি পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণের সুযোগ যেন আর দেওয়া না হয়। অথবা বিশেষ ক্ষেত্রে ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণের সুযোগ দেওয়া হলেও তা সীমিত সময়ের জন্য শুধু একবার দেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ হতে হবে মোট খেলাপি ঋণের ৫০ শতাংশ। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তোষণ করে কোনো লাভ হবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যারা নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে চলেছেন, তাদের ক্ষেত্রে সুদের হার ২ বা ৩ শতাংশ কম নির্ধারণ করা যেতে পারে। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এবং যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন, তাদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধে সামর্থ্যবান করে তোলা যেতে পারে।
ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী : অর্থনীতিবিদ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)
(অনুলিখন : এম এ খালেক)








