জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং আরও দুজনকে হত্যা মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামি অপর দুই পুলিশ কর্মকর্তার একজনের যাবজ্জীবন এবং অপরজনের ২০ বছরের সাজা হয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রোববার এ রায় দেন। এ ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মৃত্যুদণ্ডের আসামিরা হলেন-ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান (ইতোমধ্যে চানখাঁরপুলের মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে), ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। এ তিন আসামিই পলাতক। রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে; তিনিও পলাতক। এছাড়া রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি গ্রেফতার আছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে তার অধীনস্থদের উসকানি দিয়েছেন এবং এই হত্যাকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন।

এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে শহীদ ও আহতপরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের কাছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

রায়ে সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। রায় ঘোষণার পর তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, চঞ্চল চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে একটি এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশন এসেছে। আমরা বারবার ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছি, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। অতএব আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ কারণেই আপিল বিভাগে যাব।

এদিন বেলা ১১টা ৪৮ মিনিট থেকে রায় পড়া শুরু হয়। রায়ের কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের জন্য অনুমতি চান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। অনুমতি সাপেক্ষে এ কার্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি দেখানো হয়। শুরুতেই এ মামলার আসামিদের দায় পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা। এরপর চার্জ পড়েন বিচারক মোহিতুল হক এনাম। আর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ। এর আগে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে একমাত্র গ্রেফতার আসামি এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে এজলাসে তোলা হয়।

রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আর্জি তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনায় এবং তখনকার ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের আদেশে আসামিরা নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বাইরে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালান।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এ নিয়ে পঞ্চম মামলার রায় হলো। এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগ-২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় মো. নাদিম হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা। দ্বিতীয়টি, একই দিন বনশ্রী এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে পরপর ছয়টি গুলি করে গুরুতর আহত করা। তৃতীয় অভিযোগটি হলো-সেদিন বিকালে বনশ্রী এলাকায় পুলিশের একটি গুলি সাত বছরের বাসিত খান মুসার মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং তা সরাসরি তার দাদি মায়া ইসলামের পেটে বিদ্ধ হয়। এতে তিনি মারা যান।

গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আইসিটি তদন্ত সংস্থার সহকারী পরিচালক সৈয়দ আব্দুর রউফ ৩০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিলেও ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউশন ১৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করে। এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৩ অক্টোবর। আর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয় ৩ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় ছিল। এ মামলার রায় ৪ মার্চ ঘোষণার জন্য তারিখ ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন রায় ঘোষণা করা হয়নি। পরে ১৫ জুন মামলার রায় ঘোষণার জন্য নতুন দিন (রোববার) ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। সে অনুযায়ী রায় ঘোষণা করা হলো।

রায়ে শহীদ ও আহত-পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন : চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছর এবং এসআই তরিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়া হবে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, একটি বেতার বার্তার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকানোর জন্য ছাত্র-জনতার পায়ে গুলি করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান। তার মৌখিক নির্দেশনা এমন থাকলেও বাস্তবে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলি চালিয়ে এভাবে হত্যাকাণ্ড চালান মামলার আসামিরা। এতে প্রাণ হারান মায়া ইসলাম ও নাহিদ ইসলাম। এছাড়া কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে নির্বিচারে গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেছিলেন চঞ্চল চন্দ্র সরকার। স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়। এজন্য তিনটি অভিযোগের একটিতে তাকে সাজা দেওয়া হয়। বাকি দুটিতে খালাস পান তিনি।

চঞ্চলের ২০ বছরের কারাদণ্ডের রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তার ছোট ভাই উৎপল চন্দ্র সরকার বলেন, আশ্চর্যজনক একটা বিচার হলো। আজ মূলত বিষয় এটা না, বিষয় হলো আমরা সংখ্যালঘু। এই দেশে সংখ্যালঘু হিসাবে জন্মগ্রহণ করাটাই হলো আমাদের পাপ।