চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। চারদিকে নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজ পতাকার ছড়াছড়ি। বাসার ছাদ থেকে শুরু করে রাস্তার মোড়ের দোকান—সবখানেই শুধু পতাকা আর পতাকা। পাড়ায় হাঁটার সময় হাঁ করে এসব পতাকা দেখে সাকিব। নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজের বাইরেও যে কিছু পতাকা আছে, তা তার চোখ এড়ায় না। তবে সেগুলোর সংখ্যা খুবই কম। এই যেমন পাড়ার আরিফ ভাইদের বাসায় টাঙানো কালো, লাল আর হলুদ রঙের পতাকাটি; কিংবা সাঈদ ভাইদের বাসার ছাদে উড়তে থাকা সাদার মাঝে লাল যোগ চিহ্ন দেওয়া পতাকাটি।

সাকিব আসলে নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজের বাইরে অন্য কোনো পতাকা চিনত না। চেনার কারণও অবশ্য খুব সরল। সাকিবের নিজের প্রিয় দল আর্জেন্টিনা, যাদের পতাকা নীল-সাদা। আর তার বন্ধু আরমানের প্রিয় দল ব্রাজিল, যাদের পতাকা হলুদ-সবুজ। এর বাইরের পৃথিবীটা তার কাছে অজানা। অবশেষে তার চাচাতো ভাই আশরাফ তাকে বাকি পতাকাগুলো চিনিয়ে দিলেন। আশরাফ ভাইয়া মানুষটা একটু অদ্ভুত ধরনের। দিনদুপুরে খাটের ওপর বসে তিনি কবিতাটবিতা পড়েন আর চিবুক চুলকান।

আশরাফ ভাইয়া সাকিবের কৌতূহল দেখে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, ‘শোন সাকিব, দুনিয়াটা শুধু আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলেই শেষ হয়ে যায়নি। এই যে আরিফ ভাইদের বাসার কালো, লাল ও হলুদ রঙের পতাকাটি দেখছিস, এটা জার্মানির। আর সাঈদ ভাইদের ছাদের সাদার মাঝে লাল যোগ চিহ্ন দেওয়া পতাকাটি হলো ইংল্যান্ডের।’

আশরাফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্যে হাত নাড়িয়ে বললেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপে বিশ্বসেরা আরও অনেক দল আসে রে পাগলা। তাদের সবারই নিজস্ব ঐতিহ্য আছে, সুন্দর সুন্দর পতাকা আছে। যেমন ধর, টকটকে লাল পতাকার মাঝে সবুজ রঙের একটি তারা থাকলে সেটি মরক্কো। লাল-সাদা চেককাটা নকশার পতাকাটি ক্রোয়েশিয়ার। আর সাদার মাঝে টকটকে রক্তলাল বৃত্ত থাকলে সেটি হলো জাপানের পতাকা। জাপানিরা সূর্যোদয়ের দেশ, পতাকায় তারা সূর্যটাই বসিয়ে দিয়েছে। চমৎকার না?’

সাকিব তেমন কিছু বলল না। শুধু হালকা শ্বাস ফেলে হু করল।

যাহোক, আশরাফ ভাইয়াকে ধরেকয়ে সাকিব আর্জেন্টিনার একটি বড়সড় পতাকা আনিয়ে নিয়েছে। আর কয় দিন পরেই মেক্সিকোর সঙ্গে ম্যাচ। পাড়ার বড় প্রজেক্টরে খেলা দেখার বিশাল আয়োজন। সেখানে পতাকা নিয়ে হাজির সাকিবও। টান টান উত্তেজনার খেলা। প্রজেক্টরের আলোয় সবাই খেলা দেখছে। হঠাৎ ডি-বক্সে ফাউল হওয়ায় পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। শট নিতে এলেন লিওনেল মেসি। পুরো মাঠ যেন একমুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই, এমনকি যেন বাতাসে গাছের পাতাও নড়ছে না। মেসি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত মাপা শটে বল জালে জড়াতেই চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল ‘গোল! গোল!’

মেক্সিকোও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্দান্ত এক আক্রমণে তারা গোলটি পরিশোধ করে ম্যাচে সমতা ফেরাল। প্রজেক্টরের সামনে বসা আর্জেন্টিনা সমর্থক বড় ভাইদের মুখ তখন শুকিয়ে রসহীন লেবুর মতো হয়ে গেছে। এরপর দুই দলই যেন জানপ্রাণ দিয়ে লড়তে শুরু করল। তুমুল লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা আরও একটি গোল দিয়ে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিল। বাঁধভাঙা আনন্দ করতে করতে সাকিবরা ঘরে ফিরল।

পরদিন বিকেলে আকাশটা ছিল খানিকটা মেঘে ঢাকা। আশরাফ ভাইয়ার সঙ্গে মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটছিল সাকিব। আশরাফ ভাইয়া হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। একটা কৃষ্ণচূড়াগাছের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাল মেসির পেনাল্টিটা দেখেছিস?’

সাকিব বলল, ‘হ্যাঁ ভাইয়া। ফাটাফাটি!’

‘ফাটাফাটি না রে পাগল, ঠান্ডা মাথা। চারদিকে অত চিৎকার, অথচ লোকটা কী শান্ত! জীবনটাও কিন্তু এই রকম। যখন চারপাশে খুব টেনশন থাকবে, তখন মাথাটা একদম ঠান্ডা রাখতে হয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই কিন্তু মিস। আর মিস হওয়া মানেই হতাশা।’

আশরাফ ভাইয়া একটু থামলেন। তারপর সাকিবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আরেকটা জিনিস খেয়াল করছিস? মেক্সিকো কিন্তু গোল খেয়ে হতাশ হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে কামড় দিয়ে গোলটা শোধ করেছে। জীবনে ধাক্কা খাবি, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ধাক্কা খেয়ে শুয়ে পড়া যাবে না। ঘুরে দাঁড়াতে হবে।’

সাকিব কথাগুলো শুনছিল। কাল রাতের ওই খেলাটার ভেতর যে এত বড় একটা শিক্ষা লুকিয়ে আছে, সে ভাবতেই পারেনি। সে মনে মনে ভাবল, সে কখনোই এই শিক্ষা বের করতে পারত না।’ আশরাফ ভাইয়া অনেক বই পড়ে, তাই সে পেরেছে। ভাইয়ার ঘরভর্তি বই আর বই!

সে আমতা–আমতা করে বলল, ‘তার মানে ভাইয়া, মেক্সিকোর মতো কোনো বিপদ এলে দমে যাওয়া যাবে না?’

আশরাফ ভাইয়া হা হা করে হেসে উঠলেন। সাকিবের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘একদম ঠিক ধরেছিস। রেফারি যতক্ষণ শেষ বাঁশি না বাজাচ্ছে, ততক্ষণ খেলা শেষ নয়। জীবনটাও তা–ই। প্রথম ধাক্কাতেই আর্জেন্টিনা আশা ছেড়ে দিলে কিন্তু কাল জিততে পারত না। যখনই পিছিয়ে পড়বি, আর্জেন্টিনার মতো দ্বিগুণ জোরে কামব্যাক করবি।’

* আবীর আল নাহিয়ান, শিক্ষার্থী, এমসি কলেজ, সিলেট

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]