হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ঘিরে গুরুতর নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশে এই কাজের একমাত্র বৈধ অনুমোদন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। কিন্তু তাদের পাশ কাটিয়ে কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে অবৈধভাবে ‘গোপন’ চুক্তি করেছে গ্যালাক্সি ফ্যাসিলিটেশন সার্ভিস লিমিটেড। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) লাইসেন্স ছাড়া সংরক্ষিত এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির এমন কার্যক্রম জাতীয় ও এভিয়েশন নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি কাজ। এতে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যথাযথ লাইসেন্স, নিরাপত্তা ছাড়পত্র, প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক। অনুমোদনহীন কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত হলে তা শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, যাত্রী ও উড়োজাহাজের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান যুগান্তরকে বলেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিদেশি কোনো এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সরাসরি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চুক্তি করার এখতিয়ার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। তাই বিমান ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি হওয়ার কথা নয়। তবে রক্ষণাবেক্ষণ (মেইনটেন্যান্স) বা অন্যান্য সেবাসংক্রান্ত পৃথক চুক্তি থাকতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ৫০ বছর ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সই দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে আসছে এবং এ ব্যবস্থাই এখনো কার্যকর। বিমান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের সেবা দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কাতার এয়ারওয়েজ বাংলাদেশে তাদের নির্দিষ্ট গ্রাউন্ড অপারেশনে সহায়তা দিতে গ্যালাক্সির সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে। চুক্তিতে জনবল সরবরাহ, র্যাম্প অপারেশন, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবাসংক্রান্ত সহায়তাসহ বিভিন্ন অপারেশনাল সেবার উল্লেখ রয়েছে। যুগান্তরের হাতে আসা ৯ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাতার এয়ারওয়েজ ও গ্যালাক্সি লিমিটেডের মধ্যে ১ মে থেকে কার্যকর হওয়া এ চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর, যা চলবে ২০৩০ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। চুক্তি অনুযায়ী, গ্যালাক্সি ৩০ জন জনবল সরবরাহ করবে, যারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বিভিন্ন গ্রাউন্ড অপারেশনসংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত থাকবেন। চুক্তিতে তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে-চেক-ইন কাউন্টার প্রস্তুত রাখা, বোর্ডিং পাশ ও ব্যাগ সাজিয়ে রাখা, যাত্রীদের সারিবদ্ধভাবে ব্যবস্থাপনা করা। এছাড়া বোর্ডিং গেটে যাত্রীদের ওজন ও হ্যান্ড ব্যাগ পরীক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা, নিরাপত্তা তল্লাশি পয়েন্টে সহযোগিতা, বিমানের ক্যাবিনে ব্যবহৃত কম্বল, বালিশ ও হেডরেস্ট কভার পরিবর্তন, যাত্রীদের লাগেজ পৃথক্করণ, কনটেইনারে লোডিং এবং লাগেজ বেল্ট অচল হলে ম্যানুয়ালি ব্যাগ স্থানান্তরের দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে চুক্তিপত্রে বেবিচকের কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদনের উল্লেখ নেই।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা গ্যালাক্সি ফ্যাসিলিটেশন সার্ভিসেস লিমিটেড (জিএফএস) মূলত ভিএফএস গ্লোবালের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের জন্য কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা সেবা দিয়ে থাকে। তাদের ভিসা আবেদন গ্রহণ ও প্রসেসিং সেন্টারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ভিসা আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের অভিবাসনসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই (ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন) সেবাও দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরে অন্য কোনো ধরনের সেবা বা বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বেবিচকের অনুমোদিত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকায়ও গ্যালাক্সির নাম নেই।
চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে গ্যালাক্সি বাংলাদেশ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কোনো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের চুক্তি নেই। আপনাকে যে বলেছে, ভুল তথ্য দিয়েছে। তবে প্রতিবেদকের কাছে চুক্তির কপি থাকার বিষয়টি জানানো হলে তিনি প্রথমে সেটিকে ‘ভুল কাগজ’ বলে দাবি করেন। পরে বলেন, ‘তাহলে আপনার কাছে তো চুক্তির কপি আছেই, আমি আর কী বলব।’ চুক্তির সত্যতা বা বর্তমানে কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে তাদের কোনো কার্যকর চুক্তি রয়েছে কি না, এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে একপর্যায়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কাতার এয়ারওয়েজের বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মুহাম্মদ ই. ইমাম যুগান্তরকে বলেন, মার্চ পর্যন্ত গ্যালাক্সির সঙ্গে কাতার এয়ারওয়েজের যাত্রী ও কার্গো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) হিসাবে একটি চুক্তি ছিল, যার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে গ্রাউন্ড সার্ভিসেস-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যদি তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো জিএসএ চুক্তি না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে আমাদের জন্য কাজ করছে, বিষয়টি আমি অবশ্যই খতিয়ে দেখব।








